বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে তিন অক্ষরের একটি শব্দ—‘গুপ্ত’। সোশ্যাল মিডিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে শব্দটি এখন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদের ফ্লোর পর্যন্ত উত্তাপ ছড়াচ্ছে। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ‘গুপ্ত’ শব্দটি মূলত ইসলামী ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ্য করে ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক পক্ষও এই তকমা ব্যবহার করছে। তবে শিবির এই আখ্যা সহজে মেনে নেয়নি; বরং এর পাল্টা জবাব হিসেবে তারা ‘লন্ডন’ ইস্যু টেনে স্লোগান দিচ্ছে। মূলত, আওয়ামী লীগের পতনে বিএনপি নাকি জামায়াত—কার অবদান বেশি, সেই বিতর্কের সূত্র ধরেই এই ট্যাগিং রাজনীতির সূচনা হয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাঁর বক্তব্যে সরাসরি নাম উল্লেখ না করে এই ‘গুপ্ত’ রাজনীতির বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই বিতর্ককে চরম সংঘাতে রূপ দিয়েছে। দেশীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কলেজটির দেয়ালের একটি গ্রাফিতিতে ‘ছাত্র রাজনীতি’ শব্দগুচ্ছের ‘ছাত্র’ মুছে সেখানে ‘গুপ্ত’ লিখে দেওয়ায় ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। ক্যাম্পাসের এই আগুনের আঁচ গিয়ে লেগেছে জাতীয় সংসদেও। বুধবারের সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের এক সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, কেবল ‘গুপ্ত’ শব্দটি উচ্চারণ করার কারণেই ছাত্রদলের ওপর হামলা চালিয়েছে শিবির। এর তীব্র প্রতিবাদ জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সরকারি দলের এমন বক্তব্যকে ‘উসকানিমূলক ও অসংসদীয়’ আখ্যা দিয়ে তা কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ বা প্রত্যাহারের দাবি জানান। পাল্টাপাল্টি এই বক্তব্যে স্পিকারকেও রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়।
এই ‘গুপ্ত’ বিতর্কের শিকড় মূলত লুকিয়ে আছে গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতায়। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে অন্য সংগঠনগুলোর প্রকাশ্যে রাজনীতি করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এক বিস্ময়কর চিত্র সামনে আসে। এতদিন যারা ছাত্রলীগের পদধারী নেতা হিসেবে মিছিলের সামনে থাকতেন কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থীর পরিচয়ে ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিলেন, তারা হঠাৎ করেই নিজেদের ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সভাপতি সাদিক কায়েম ও সেক্রেটারি এস এম ফরহাদের মতো নেতাদের অতীত ঘাটলে দেখা যায়, তারাও একসময় গেস্টরুমে নৌকার স্লোগান দিয়েছেন কিংবা ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। শিবিরের ভাষ্যমতে, সেই বৈরী পরিবেশে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে ক্যাম্পাসে পড়াশোনা ও টিকে থাকতেই তাদের পরিচয় গোপন রাখার কৌশল নিতে হয়েছিল।
তবে, ছাত্রদল এই বিষয়টিকে নিছক ‘টিকে থাকার কৌশল’ হিসেবে মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, শিবির কর্মীরা ছাত্রলীগের সাথে মিশে অনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছে এবং এখন তারা সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানার ব্যবহার করে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে। মূলত ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাসগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও হল দখলের চেষ্টাতেই ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে এই আধিপত্যের লড়াই শুরু হয়েছে। অন্যদিকে শিবিরের পাল্টা দাবি, তাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্থান ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতায় ঈর্ষান্বিত হয়েই ছাত্রদল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ট্যাগিং বা তকমা দেওয়ার রাজনীতি শুরু করেছে। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও পেশিশক্তির মহড়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে এখন একটাই শঙ্কা—দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখগুলোর হঠাৎ পরিচয় বদল এবং আধিপত্য বিস্তারের এই নতুন লড়াই কি আবারও ক্যাম্পাসগুলোতে হল দখল আর সশস্ত্র সংঘাতের সেই পুরোনো অন্ধকার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনবে?