• শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৪ অপরাহ্ন
Headline
দুই মাসেই তলানিতে বিএনপির জনপ্রিয়তা, সরকারের দলীয়করণ নিয়ে তোপ নাহিদের জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর সরকার, বিয়ামের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা গণভোটের ৭০ শতাংশ রায় উপেক্ষিত, নতুন ফ্যাসিবাদ নিয়ে বিএনপিকে জামায়াতের তোপ ১ মে পল্টনে শ্রমিক দলের সমাবেশ, নির্বাচন নিয়ে জামায়াতকে ফখরুলের তোপ বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিত, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নতুন কড়াকড়ি রাজধানীর ৮০ পাম্পে ১২ লাখ বাইকের জটলা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে? “ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরানে ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধ, যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের জোর প্রস্তুতি জামায়াতের ‘লাফিং গ্যাস’: যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এটি মারাত্মক আসক্তির কারণ হয়ে উঠেছে

টিকার মজুত নিয়ে ধোঁয়াশা: বাফার স্টক শূন্য, সংকটে মরণব্যাধি জলাতঙ্কের টিকা

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনার মধ্যেই এবার আরেক মরণব্যাধি জলাতঙ্কের টিকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে জলাতঙ্কের টিকা পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে বাধ্য হয়ে দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি দামে বাইরে থেকে টিকা কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অন্যদিকে, সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় থাকা হাম, যক্ষ্মা, পোলিওসহ ৯টি টিকার জরুরি মজুত বা ‘বাফার স্টক’ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে জানা গেছে। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই সংকটের কথা সরাসরি অস্বীকার করছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।


জলাতঙ্কের টিকার তীব্র সংকট ও রেশনিং

কুকুর বা বিড়ালের কামড় বা আঁচড় থেকে শতভাগ প্রাণঘাতী রোগ জলাতঙ্ক বা র‍্যাবিস ছড়ায়। এই রোগ প্রতিরোধে দুই ধরনের ভ্যাকসিন বা টিকা দেওয়া হয়:

১. এআরভি (অ্যান্টি র‍্যাবিস ভ্যাকসিন): এটি শরীরের নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরি করতে উদ্দীপিত করে এবং দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেয়।

২. আরআইজি (র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন): এটি সরাসরি কামড়ের ক্ষতস্থানে দেওয়া হয়। এতে আগে থেকে তৈরি অ্যান্টিবডি থাকে, যা সরাসরি ভাইরাসের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেয়।

কুকুর বা বিড়াল কামড়ে গভীর ক্ষত তৈরি করলে আরআইজি ভ্যাকসিনটি দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই দ্বিতীয় ধরনের ভ্যাকসিনেরই তীব্র সংকট চলছে।

মাঠপর্যায়ের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, মুন্সীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলার সদর হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ত্রিশজন মানুষ কুকুর বা বিড়ালের কামড়ের শিকার হয়ে টিকা নিতে আসেন। কিন্তু সরকারি সরবরাহ না থাকায় তাদের বেশির ভাগকেই বাইরে থেকে চড়া দামে টিকা কিনতে হচ্ছে।

এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুটি সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে:

  • কেন্দ্রীয় সরবরাহের অভাব: ঢাকা থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন আর নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকা সরবরাহ করছে না।

  • বাজেট সংকট: হাসপাতালগুলোকে বলা হয়েছে নিজস্ব ফান্ড (MSR) থেকে টিকা কিনে রোগীদের দিতে। কিন্তু আলাদা কোনো বাজেট বা অর্থ বরাদ্দ না থাকায় তারা পর্যাপ্ত টিকা কিনতে পারছে না।

বাধ্য হয়ে হাসপাতালগুলো এখন ‘টিকা রেশনিং’ বা বরাদ্দ সীমিত করার নীতি গ্রহণ করেছে। যারা অত্যন্ত দরিদ্র বা যাদের অবস্থা খুবই গুরুতর, শুধু তাদেরকেই বিনামূল্যে সরকারি টিকা দেওয়া হচ্ছে। আর যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল বা শখের বশে বিড়াল পালেন, তাদের বলা হচ্ছে বাইরে থেকে টিকা কিনে আনতে। জেলা শহরে কিছু টিকা পাওয়া গেলেও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে জলাতঙ্কের টিকার মজুত একেবারেই শূন্য। অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে, যেখানে টিকার সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক রয়েছে।


শূন্যের কোঠায় ‘বাফার স্টক’: ঝুঁকিতে ইপিআই কার্যক্রম

জলাতঙ্কের টিকার পাশাপাশি দেশের সবচেয়ে সফল স্বাস্থ্যসেবা ‘সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি’ বা ইপিআইয়ের আওতাধীন টিকাগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ইপিআইয়ের অধীনে শিশুদের মোট ৯টি মারাত্মক রোগ প্রতিরোধে টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • যক্ষ্মা প্রতিরোধে ‘বিসিজি’

  • পোলিও প্রতিরোধে ‘ওপিভি’

  • নিউমোনিয়া প্রতিরোধে ‘পিসিভি’

  • হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে ‘এমআর’

  • টাইফয়েড প্রতিরোধে ‘টিসিভি’

হামের টিকার অভাবে ইতোমধ্যেই দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে এবং শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা এনে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করলেও সামগ্রিক টিকার মজুত পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

কেন্দ্রীয় ইপিআই গুদামের তথ্যমতে, দেশব্যাপী নিয়মিত চাহিদার পাশাপাশি আপৎকালীন সময়ের জন্য অন্তত তিন মাসের টিকার মজুত রাখতে হয়, যাকে স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের ভাষায় ‘বাফার স্টক’ (Buffer Stock) বলা হয়। কিন্তু বর্তমানে এই বাফার স্টক একেবারেই শূন্য। ৯টি টিকার মধ্যে বেশ কয়েকটির মজুত তলানিতে এসে ঠেকেছে এবং একটি মাত্র টিকার মজুত আগামী ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাফার স্টক না থাকাটা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বিশাল ঝুঁকি। কোনো কারণে যদি নিয়মিত টিকা আমদানি বা সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়, তবে হামের মতো অন্যান্য রোগগুলোও মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।


অস্বীকার ও ধোঁয়াশা: কী বলছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়?

মাঠপর্যায়ে টিকার চরম হাহাকার এবং কেন্দ্রীয় গুদামে বাফার স্টক শূন্য হওয়ার খবরের মধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করছে যে, দেশে কোনো টিকারই সংকট নেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সুস্পষ্টভাবে দাবি করেছেন, “আমাদের হাতে ৬ মাসের টিকার স্টক আছে। যক্ষ্মার বিসিজিসহ ৯টি টিকার সবগুলোই আমাদের হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে।”

জলাতঙ্কের টিকার সংকট প্রসঙ্গেও তিনি একই সুর বজায় রেখে বলেন, “জলাতঙ্কের টিকার একটা ক্রাইসিস হয়েছিল, যা আমরা ইতিমধ্যেই মোকাবিলা করেছি। এখন সবখানে সাপ্লাই আছে। হাসপাতালগুলো এমএসআর এবং এডিবি ফান্ড থেকে স্থানীয়ভাবে টিকা কিনছে। টিকা নিতে এসে কেউ ফেরত যাচ্ছে না।”

তবে মন্ত্রীর এই আশ্বাসের সঙ্গে সাধারণ রোগী এবং খোদ সরকারি হাসপাতালের পরিচালকদের বক্তব্যের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না, যা পুরো পরিস্থিতিকে আরও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে তুলেছে।


সংকটের নেপথ্য কারণ: ‘অপারেশন প্ল্যান’ বাতিল এবং পূর্বপ্রস্তুতির অভাব

বাংলাদেশে শুধু টিকা নয়, টিকা পরিবহন কর্মীদের বেতনও প্রায় দশ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। দেশের এত সফল একটি টিকাদান কর্মসূচিতে কেন হঠাৎ এই আর্থিক ও কাঠামোগত স্থবিরতা নেমে এলো?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ হলো স্বাস্থ্য খাতের ‘অপারেশন প্ল্যান’ বা ‘ওপি’ (Operation Plan) হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া। অপারেশন প্ল্যান হলো স্বাস্থ্য খাতের পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, যেখানে পাঁচ বছরের কেনাকাটা এবং টিকাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির বাজেট আগে থেকেই পাস করা থাকে। এর অর্থায়ন যৌথভাবে সরকার ও বিদেশি দাতা সংস্থাগুলো করে থাকে। এই প্ল্যান থাকার কারণে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত টিকা ও ওষুধ কেনা সম্ভব হয়।

অতীতে এই অপারেশন প্ল্যানের কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় পূর্ববর্তী সরকারের সময়ই এটি থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তাভাবনা চলছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৫ সালে কোনো ‘এক্সিট প্ল্যান’ বা বিকল্প দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই এই ওপি বাতিল করে দেয়।

এর সরাসরি ফলস্বরূপ, ওপির আওতাধীন টিকাদান কর্মসূচি, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো হঠাৎ করে মুখ থুবড়ে পড়ে। বিকল্প কোনো আর্থিক কাঠামো বা জরুরি কেনাকাটার ব্যবস্থা না থাকায় হাসপাতালগুলো এবং ইপিআই কর্তৃপক্ষ চাহিদামতো টিকা কিনতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সরকার যদি দ্রুত এই বাতিলকৃত ওপির বিকল্প কোনো সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণ না করে, তবে আগামী অর্থবছরেও দেশের স্বাস্থ্য খাতে বাজেট থাকবে না। এর ফলে প্রয়োজনীয় সময়ে টিকা ও ওষুধ কেনা সম্ভব হবে না এবং জনস্বাস্থ্যের এই সংকট আরও চরম আকার ধারণ করবে। মরণব্যাধি থেকে শিশুদের বাঁচাতে এবং স্বাস্থ্য খাতের এই ধস ঠেকাতে সরকারকে দ্রুত অস্বীকারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবমুখী ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category