দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা রোধে চালু হওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্যামেরাগুলো অভাবনীয় ফলাফল দেখাতে শুরু করেছে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে হাইওয়ে পুলিশের উদ্যোগে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই আধুনিক প্রযুক্তির প্রথম দিনেই চালকদের বেপরোয়া আচরণ ধরা পড়ে এবং চারশতের বেশি মামলা রেকর্ড করা হয়। কিন্তু প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও স্বয়ংক্রিয় জরিমানার ভয়ে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে সেই মামলার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে একেবারে নগণ্য পর্যায়ে নেমে এসেছে। কোনো ধরনের মানব হস্তক্ষেপ বা দুর্নীতির সুযোগ ছাড়াই সরাসরি ডিজিটাল পদ্ধতিতে অপরাধ শনাক্ত হওয়ায় চালকদের মধ্যে চরম সতর্কতা তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে চলা মহাসড়কের নৈরাজ্য দূর করতে এক বড় ধরনের আশার আলো জ্বালিয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে শুরু করে একেবারে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত দীর্ঘ আড়াইশ কিলোমিটারজুড়ে মোট এক হাজার চারশ সাতাশটি সর্বাধুনিক এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় চারশ নব্বইটি সুউচ্চ খুঁটির ওপর বসানো এসব ক্যামেরা একটি সেন্ট্রাল ডেটা সেন্টার এবং পাঁচটি সুসজ্জিত মনিটরিং সেন্টারের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ১৪২ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই বিশেষ প্রকল্পের মূল কাজ হলো নির্ধারিত গতির সীমা লঙ্ঘন করে গাড়ি চালানো, হুটহাট উল্টো পথে গাড়ি নিয়ে চলে আসা, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং করা, সিগন্যাল অমান্য করা কিংবা নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলার বা বাইক চলাচলের মতো গুরুতর অনিয়মগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা। প্রযুক্তির এই সুবাদে ক্যামেরা চোখের পলকে অপরাধী গাড়ির নম্বর প্লেট ধরে ছবি তুলে ফেলছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে গাড়িচালকের মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল মামলা ও জরিমানার মেসেজ পৌঁছে দিচ্ছে।
প্রযুক্তি চালুর উদ্বোধনের দিন অর্থাৎ গত মঙ্গলবার অতিরিক্ত গতি এবং উল্টো পথে গাড়ি চালানোর অপরাধে সারা দেশে মোট চারশো ছেচল্লিশটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে কেবল অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর দায়ে চারশো সতেরোটি মামলা হয়েছিল, যার সিংহভাগ অর্থাৎ তিনশো সাতান্নটি হয়েছিল কুমিল্লা অঞ্চলে এবং বাকিগুলো গাজীপুর অঞ্চলে। এছাড়া উল্টো পথে গাড়ি চালানোর দায়ে মোট ঊনত্রিশটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু এর ঠিক পরের দিন বুধবার যখন দ্বিতীয় দিনের মতো নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়, তখন অবাক করার মতো চিত্র দেখা যায়। দ্বিতীয় দিনে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর দায়ে মামলার সংখ্যা হু হু করে কমে মাত্র বিয়াল্লিশটিতে নেমে আসে এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো ওই দিন উল্টো পথে গাড়ি চালানোর কোনো ঘটনাই ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। এক দিনের ব্যবধানে মামলার এই বিশাল পতন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চালকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন এবং আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছেন।
পুলিশ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করছেন যে এই ডিজিটাল নজরদারির ফলে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল সংস্কৃতি থেকে মহাসড়ক ধীরে ধীরে মুক্ত হবে। হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মুনতাসিরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, যেহেতু পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অটোমেটিক বা স্বয়ংক্রিয়, তাই এখানে কোনো প্রকার সুপারিশ বা লেনদেনের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। ক্যামেরা ছবি তুলে সরাসরি মোবাইলে মামলা পাঠিয়ে দিচ্ছে এবং সেই জরিমানা পরিশোধ করতেই হচ্ছে, যার ফলে মামলা এড়ানোর কোনো রাস্তা খোলা নেই। কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছে যে এই উদ্যোগের সুফল কতটুকু স্থায়ী হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা সত্যিকার অর্থে কমছে কি না, তা তারা নির্দিষ্ট সময় পরপর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করবেন। তবে সাধারণ যাত্রীরাও ইতোমধ্যে এর সুফল অনুভব করতে শুরু করেছেন। নারায়ণগঞ্জের নিয়মিত বাসযাত্রী ও সাধারণ মোটরচালকরা জানিয়েছেন যে আগের মতো আর বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর সাহস কেউ পাচ্ছে না, যা সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
পরিবহন মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকেও এই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন যে মালিক ও চালকদের কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো অবস্থাতেই মহাসড়কে আইন অমান্য করা না হয়। সরকারের আইন অনুযায়ী আশির বেশি গতিতে গাড়ি চালালে মোটা অঙ্কের জরিমানা দিতে হয় এবং এআই ক্যামেরার কারণে সেই জরিমানা এড়ানোর কোনো সুযোগ না থাকায় চালকরা বাধ্য হয়ে নিয়ম মেনে চলছেন। পাশাপাশি গাড়িগুলোর ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের সময় এই ডিজিটাল ক্যামেরার তথ্যগুলো যাচাই করা আরও সহজ হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের পুরো পরিবহন খাতকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে সাহায্য করবে।