সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে হাকিমপুর সীমান্তে এক অভূতপূর্ব ও হৃদয়বিদারক মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ছে। তাদের চোখেমুখে তীব্র আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ভিটেমাটি, সংসার ও আপন ঠিকানা পেছনে ফেলে রাতের অন্ধকারে নদী সাঁতরে বা সীমান্তের কাঁটাতারের দিকে ছুটছেন এই দিশেহারা মানুষগুলো। ভারতের নবগঠিত সরকারের কঠোর নীতি এবং ডিটেনশন ক্যাম্প বা আটক কেন্দ্রের ভয়ে লাখো মানুষের জীবনে এখন চরম দুর্যোগ নেমে এসেছে।
চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ক্ষমতায় আসাই মূলত এই ঘটনার সূত্রপাত করেছে। নির্বাচনের আগেই দলটির অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল নথিপত্রহীন অভিবাসীদের শনাক্ত করা এবং তাদের বিতাড়ন। এর মধ্যেই ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা দিয়েছেন, যারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন তারা যদি স্বেচ্ছায় ফিরে যান, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি মামলা হবে না। অন্যদিকে, যারা ধরা পড়বেন তাদের ঠাঁই হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে। এই স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের চাপ এবং আইনি ব্যবস্থার কড়াকড়িতে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয় যখন গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ডিটেনশন বা হোল্ডিং সেন্টার নির্মাণের নির্দেশ জারি করে। উত্তর চব্বিশ পরগনার তেঁতুলিয়া গ্রামে কড়া পুলিশি পাহারায় ইতোমধ্যে এমন একটি সেন্টার প্রস্তুত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
যাদের জীবনে এই দুর্যোগ নেমে এসেছে, তাদের গল্পগুলো প্রায় একই রকম। হাসিনা বিবি কিংবা আব্দুল শেখের মতো হাজারো মানুষের জন্ম হয়তো এই দেশেই, কিন্তু নিজেদের বৈধতা প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত বা সঠিক কাগজ তাদের কাছে নেই। আবার অনেকেই হয়তো নিছক চিকিৎসার প্রয়োজনে বা কাজের সন্ধানে সেখানে গিয়েছিলেন। এখন পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান, তল্লাশি এবং স্থানীয় বাড়িওয়ালাদের প্রবল চাপের মুখে তারা বাধ্য হয়েই নিজেদের আশ্রয়স্থল ছাড়ছেন। লোকমুখে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে যে, হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা তুলনামূলক সহজ। আর এই গুজবে কান দিয়েই শিয়ালদহ বা বনগাঁ লোকাল ট্রেনে চেপে প্রতিদিন শত শত মানুষ স্বরূপনগর থানা এলাকায় এসে ভিড় জমাচ্ছেন।
সীমান্তে পৌঁছানোর পর এই মানুষগুলোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এবং স্থানীয় পুলিশ সেখানে অবস্থানরত মানুষদের নাম, পরিচয় এবং বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করছে। কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক মানুষের সঠিক কোনো সরকারি পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ করা হয়নি। বাস্তবতা হলো, এই মানুষগুলো এখন এক অদ্ভুত ও করুণ টানাপোড়েনের শিকার। ভারত সরকার তাদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে পুশব্যাক করতে চাইছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কঠোর অবস্থান নিয়েছে যে, নাগরিকত্বের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কাউকেই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে গ্রহণ করা হবে না। বর্ষার এই উত্তাল সময়ে রাতের অন্ধকারে নদীপথে এমন জোরপূর্বক পুশব্যাক ঠেকানো দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের জন্যই এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই মানুষগুলোর কাছে যে একেবারেই কোনো কাগজপত্র নেই, বিষয়টি পুরোপুরি এমন নয়। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তে অপেক্ষমাণ অনেকের কাছেই ভারতের আধার কার্ড, প্যান কার্ড বা সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র রয়েছে। এদের অনেকেই বিগত লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে ভোটাধিকারও প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু নতুন নিয়মের বেড়াজালে পড়ে রাতারাতি হাজার হাজার পরিবারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। ফলে যে পরিচয়পত্রগুলো এত দিন তাদের আইনি সুরক্ষা দিচ্ছিল, সেগুলো এক ঝটকায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আইনি বৈধতা হারানোর এই চরম মুহূর্তটি আরেক দিক থেকে ভারতের অর্থনীতির জন্যও একটি বড় ধাক্কা। এই নথিপত্রহীন মানুষগুলো পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সস্তা শ্রমশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। রাজমিস্ত্রি, গৃহকর্মী কিংবা দিনমজুর হিসেবে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, কোনো প্রকার সুষ্ঠু আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে, কেবল জাতিগত বা ধর্মীয় প্রোফাইলিংয়ের ভিত্তিতে আসাম থেকে এর আগে যেভাবে শত শত মানুষকে জোরপূর্বক সীমান্তে এনে পুশব্যাক করা হয়েছিল, সেই একই মডেল এখন পশ্চিমবঙ্গেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। আসামের সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখার পর পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত সাধারণ ও প্রান্তিক কর্মজীবী মানুষের মাঝে আতঙ্ক আরও প্রকট রূপ নিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছেন, এই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে শেষ পর্যন্ত চরম মূল্য চুকাতে হচ্ছে তাদেরই। কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়া এই গণবিতাড়ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় এক বিশাল রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর জন্ম দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও এক নতুন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত চাপের সৃষ্টি হচ্ছে, যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী এই ঠিকানাহীন সাধারণ মানুষগুলো।