চলতি বৈশাখের শুরু থেকেই যেন আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত ২০টি জেলার জনজীবন রীতিমতো ওষ্ঠাগত। আর প্রকৃতির এই রুদ্ররোষের সাথে পাল্লা দিয়ে জনদুর্ভোগের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিচ্ছে ভয়াবহ লোডশেডিং। বর্তমানে বিদ্যুতের এই হাহাকার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শহরাঞ্চলে পরিস্থিতির কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, দেশের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। সরকারি হিসাবমতে দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের ঘাটতি আড়াই হাজার মেগাওয়াট বলা হলেও, মাঠপর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর বাস্তব তথ্য বলছে এই ঘাটতির পরিমাণ চার হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে যে বিশাল ধস নেমেছে, তার সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান এই টালমাটাল পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বর্তমান সংকটের কথা স্বীকার করে নেন। তিনি জানান, শহরের মানুষের সাথে গ্রামাঞ্চলের মানুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে এখন থেকে ঢাকা শহরেও নিয়ম করে লোডশেডিং দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতিমন্ত্রীর মতে, কাগজে-কলমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আকাশছোঁয়া দেখানো হলেও, বাস্তবতার সাথে এর যোজন যোজন দূরত্ব রয়েছে। তিনি এই সংকটের জন্য বিগত সরকারের ভ্রান্ত নীতিকে দায়ী করে বলেন, বর্তমান এই পুঞ্জীভূত সমস্যার দায় কোনোভাবেই নবনির্বাচিত সরকারের নয়। বরং বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি, অপরিকল্পিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনার দায়ভারই এখন গোটা জাতিকে বইতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের এই বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান অস্থিতিশীলতা একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং কয়লার সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তার কারণে জ্বালানির পরিবহন ব্যয় ও ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ বাধ্য হয়ে বিকল্প উৎস থেকে এসব জ্বালানি সংগ্রহ করলেও, উন্মুক্ত দরপত্র বা জিটুজি চুক্তিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই চরম আর্থিক চাপের কারণে শুধু এলএনজি আমদানি করতেই গত মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত সরকারের অতিরিক্ত চার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি বাবদ যে ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, তা ইতিমধ্যেই শেষ; উল্টো আগামী জুন পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে আরও ১৯ হাজার কোটি টাকার জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণ শর্তের কারণে সরকার চাইলেও যথেচ্ছভাবে ভর্তুকি বাড়াতে পারছে না, যা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা এবং উৎপাদনের হিসাব মেলাতে গেলে এক চরম হতাশাজনক চিত্র সামনে আসে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২১৮ মেগাওয়াট। কিন্তু এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৮৬৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩৫২ মেগাওয়াট। অথচ অবাক করা বিষয় হলো, বর্তমানে দেশে ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যাদের সর্বমোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট! এই বিপুল সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই বছরের পুরোটা সময় অলস বসে থাকে ক্যাপাসিটি চার্জ গিলে খাচ্ছে। দেশের মোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশই তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। কিন্তু চরম জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, যার মধ্যে ১০টি গ্যাসভিত্তিক এবং ৮টি তেলভিত্তিক। এছাড়া গ্যাস ও তেলের অভাবে আরও অন্তত ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।
গ্যাস সরবরাহের এই করুণ দশার কথা খোদ বিদ্যুৎ বিভাগই স্বীকার করেছে। একটি গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে হলে দৈনিক অন্তত ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। যদি অন্তত ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ করা যেত, তবে অনায়াসেই সাত হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৮৫ থেকে ৯২ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার সাশ্রয় করার জন্য সরকার বাধ্য হয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যবহার একদম কমিয়ে দিয়েছে। পিডিবি ধারণা করছে, এবারের গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে না পারায় সরকার এখন এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে।
আর্থিক সংকটের পাশাপাশি বড় মেগা প্রকল্পগুলোর কারিগরি ত্রুটিও এই লোডশেডিংয়ের আগুনে ঘি ঢেলেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বর্তমানে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে আছে। ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় ইউনিট গত কয়েক বছর ধরেই বিকল। একমাত্র ভরসা ছিল প্রথম ইউনিটটি, কিন্তু কয়লার সাথে পাথর মিশ্রিত থাকার কারণে গত বুধবার রাতে এর চারটি কোল মিলের মধ্যে দুটি ভেঙে যায়, ফলে পুরো কেন্দ্রটির উৎপাদন এখন শূন্যের কোঠায়। এছাড়া ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ রয়েছে এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এস আলমের এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিটেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ আশা করছে যে, আগামী ২৬ থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে এই কেন্দ্রগুলো পুনরায় উৎপাদনে ফিরবে এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি নতুন সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎ খাতের জন্য অশনিসংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে। গত ২১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ বিভাগের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২ হাজার ৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ভর্তুকি ছাড় করলেও, সেখানে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কঠিন শর্ত। বলা হয়েছে, এই অর্থ কেবল বেসরকারি খাতের রেন্টাল ও আইপিপি কেন্দ্রগুলোকে দেওয়া যাবে। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় তিনটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র—পায়রা, রামপাল ও পটুয়াখালীকে এই ভর্তুকির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে, কারণ সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নেই। এমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও শর্তের বেড়াজালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় সামনে আরও ভয়াবহ অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই চরম বিদ্যুৎ ঘাটতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের কৃষি, শিল্প ও শিক্ষায়। বিশেষ করে চলতি বোরো মৌসুমে সেচ পাম্পগুলো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। যশোর ও মাগুরার মতো জেলাগুলোতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। মাগুরায় ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৮ থেকে ৯ মেগাওয়াট। ফলে প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া এবং হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। সরকারের তরফ থেকে মে মাসে পরিস্থিতি উন্নতির আশ্বাস দেওয়া হলেও, কারিগরি ত্রুটি, জ্বালানি আমদানির বিশাল ব্যয় এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান সমীকরণ মিলিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের এই অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তের আলো আপাতত বেশ দূরেই মনে হচ্ছে।