• শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০৬:৫৫ অপরাহ্ন
Headline
টিনএজের যে দোষগুলো আসলে গুণ আগামীকাল দেশজুড়ে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন: যা জানা জরুরি ভারতের মেডিকেল কলেজে ক্লাস নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের পলাতক সাবেক এমপি কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি: সাবেক ডিএমপি কমিশনারসহ ৫ জনের রায় কাল ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ৯২০ ছাড়াল, নতুন কম্পনে আতঙ্ক ওয়াশিংটনে ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি: হিজবুল্লাহর তীব্র বিরোধিতা ইতালিতে এক পরিবারের তিন সদস্যকে ছুরিকাঘাতে হত্যা: শোকের ছায়া কোম্পানীগঞ্জে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে ফের শুরু বেক্সিমকো ফার্মার লেনদেন গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামির দা’র কোপে আহত দুই পুলিশ কর্মকর্তা শান্তিচুক্তির ‘প্রকাশ্য লঙ্ঘন’ করছে যুক্তরাষ্ট্র: ইরান

তিস্তা মহাপরিকল্পনা: উত্তরের মরুকরণ রোধ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের অন্যতম প্রধান অর্জন হলো তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা বা ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’-এর অগ্রগতি। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীন সরকারের আনুষ্ঠানিক কারিগরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য এক বিশাল আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। তিস্তাপাড়ের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত এই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা। বর্তমানে নদীটির যে জীর্ণ দশা, তাতে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চল মরুভূমির রূপ নেয় এবং বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা ও নদী ভাঙনের কবলে পড়ে হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কেবল বন্যা ও ভাঙন রোধই হবে না, বরং তিস্তা হয়ে উঠবে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির নতুন করিডোর।

প্রকল্পটির মূল কারিগরি রূপরেখার দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি কেবল একটি নদী খনন প্রকল্প নয়। এর আওতায় নদীর দুই তীরে শক্তিশালী গাইড বাঁধ নির্মাণ, গভীর খননের মাধ্যমে নদীর নাব্য বৃদ্ধি, এবং পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু জলাধার বা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই অবকাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে, যা সেচ কার্যক্রমকে সচল রাখবে। বর্তমানে পানির অভাবে উত্তরের বিশাল কৃষি জমি আবাদি করা সম্ভব হয় না; কিন্তু তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষকরা সারা বছর সেচের সুবিধা পাবেন, যা ফসলের উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এটি কেবল কৃষিজ উৎপাদনই বাড়াবে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করবে। মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নদীর তীরবর্তী এলাকায় শিল্পাঞ্চল তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। নদীপথের নাব্যতা বাড়লে নৌপরিবহণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আসবে। ভারী পণ্য পরিবহণে নৌপথ সাশ্রয়ী হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অভ্যন্তরীণ মৎস্য সম্পদের ভাণ্ডার গড়ে তোলার সম্ভাবনাও এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার মধ্যে এই প্রকল্পের গুরুত্ব আলাদাভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, যা থেকে প্রমাণিত হয় বর্তমান সরকার উত্তরাঞ্চলের বৈষম্য দূর করতে কতটা বদ্ধপরিকর।

ঋণ ও অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে একধরনের কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক। চীন সাধারণত তাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় আলোচনার মূল টেবিলে ছিল ঋণের সুদের হার কমানো এবং পরিশোধের সময়সীমা বা গ্রেস পিরিয়ড বৃদ্ধি করা। চীন সরকার তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে ঋণের শর্তাবলি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও প্রকল্পের ব্যয়ভার ও ঋণের সুদ চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে, তবুও সরকার এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। শ্রীলঙ্কা বা অন্য দেশের মতো ঋণের ফাঁদ এড়াতে সরকার নিজস্ব রাজস্ব আয় ও প্রকল্পের অর্থনৈতিক উপযোগিতার ওপর ভিত্তি করে আলোচনার টেবিল সাজাচ্ছে। ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদী পরিশোধ পরিকল্পনার পাশাপাশি এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত পণ্য ও অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ঋণের কিস্তি পরিশোধে বড় ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তিস্তা ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। এ নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে যে জটিলতা রয়েছে, তা নিরসন করতে সরকার অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, যেহেতু প্রকল্পটি পুরোপুরি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে বাস্তবায়িত হবে এবং এটি কেবল পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, তাই এটি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে না। বরং পরিকল্পিত ও আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে। পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ বা ইআইএ (EIA) সম্পন্ন করার মাধ্যমে নদীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বর্তমান সরকারের আমলে নেয়া এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই উত্তরবঙ্গের সাথে রাজধানী ঢাকার অর্থনৈতিক বৈষম্য ঘুচিয়ে দেয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কেবল অবকাঠামোর উন্নয়ন নয়, এটি একটি অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান। চীন এই মহাপরিকল্পনায় কেবল ঋণদাতা হিসেবে নয়, বরং কারিগরি ও প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে, যা আমাদের দেশীয় প্রকৌশলীদের জন্য নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে। স্থানীয় প্রকৌশলীদের সাথে চীনের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের কাজের সমন্বয় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের গতি আরও বাড়িয়ে তুলবে। সরকার যে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, তাতে তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য এক নতুন ইতিহাসের সূচনা। এটি কেবল সেচ বা পানি ব্যবস্থাপনার প্রকল্প নয়, এটি একটি জনপদকে ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচিয়ে নতুন জীবন দেয়ার উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এই স্বপ্নের বাস্তব রূপায়নে এক বড় মাইলফলক। ঋণের শর্তাবলি ও কারিগরি দিকগুলোর ভারসাম্য ঠিক রেখে যদি প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেয়া যায়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে বর্তমান সরকারের এক অবিস্মরণীয় সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। উত্তরের মানুষ এখন স্বপ্ন দেখছে সেই দিনের, যখন তিস্তার চরে আর হাহাকার থাকবে না, বরং পানির কলকল ধ্বনি ও সবুজের সমারোহে মুখর হয়ে উঠবে চারপাশ। এই দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়াটাই এখন সরকারের বড় পরীক্ষা এবং দেশবাসীর প্রত্যাশা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category