মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থায় দেশে যখন জ্বালানি তেলের তীব্র হাহাকার চলছে, তখন রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল বিপণন কোম্পানির এক চাঞ্চল্যকর অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। সরকারিভাবে তেলের রেশনিং পদ্ধতি চালুর ঠিক আগ মুহূর্তে, মাত্র সাত দিনে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি থেকে ডিলারদের হাতে পৌঁছে গেছে রেকর্ড পরিমাণ পৌনে ২ লাখ টন জ্বালানি তেল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বিপুল পরিমাণ তেলই বর্তমানে সারা দেশে অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির প্রধান উৎস।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত—এই সাত দিনে তিন কোম্পানি মিলে ডিলারদের সরবরাহ করেছে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন তেল। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে সরবরাহ করা হয়েছে ২৫ হাজার টন। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই তিন কোম্পানি মিলে দৈনিক গড়ে মাত্র ১১ থেকে ১২ হাজার টন তেল সরবরাহ করে থাকে। রেশনিং চালুর ঠিক আগের এই বিশেষ সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ বা অতিরিক্ত ১৩-১৪ হাজার টন তেল প্রতিদিন বাজারে ছাড়া হয়েছে, যা চরম নিয়মবহির্ভূত বলে মনে করা হচ্ছে।
কোম্পানিভিত্তিক সরবরাহের চিত্র:
মেঘনা অয়েল: ১ থেকে ৫ মার্চের মধ্যে ডিলারদের দিয়েছে ৫০ হাজার ৪১৩ টন (দৈনিক গড়ে ১০ হাজার টনের বেশি)।
পদ্মা অয়েল: সাত দিনে সরবরাহ করেছে ৪১ হাজার ২৫৮ টন (দৈনিক গড়ে ৬ হাজার ৮৭৬ টন)।
যমুনা অয়েল: একইভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ তেল সরবরাহ করেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, যখন সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রেশনিং এবং অফিস-দোকান বন্ধের সময়সীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করছিল, ঠিক তখনই ডিলারদের হাতে এই বিপুল মজুদ তুলে দেওয়া হয়। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই তেলের বড় অংশই সাধারণ মানুষের হাতে না গিয়ে সরাসরি কালোবাজারি ও অসাধু মজুতদারদের হাতে চলে গেছে। ফলশ্রুতিতে রেশনিং চালুর পর সাধারণ মানুষ তেলের জন্য হাহাকার করলেও প্রশাসনের অভিযানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবৈধ মজুত ধরা পড়ছে।
এই ভয়াবহ অনিয়মের বিষয়ে বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। সহকারী ব্যবস্থাপক ফারজিন হাসান মৌমিতা বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী একে ‘স্পষ্ট অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “তেল সেক্টরটি চোর দিয়ে ভরা। যখন তেলের সংকট প্রকট হবে তা তারা জানতেন, তবুও নিজেদের পকেট ভারী করতে ডিলারদের হাতে এই মজুদ তুলে দিয়েছেন। রাষ্ট্রের উচিত এই দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা।”
বর্তমানে দেশে বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৮ লাখ টন, যার মধ্যে ৬৩ লাখ টনই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। মোট আমদানির প্রায় ২২ শতাংশ বা ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি হয়ে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটি বন্ধ থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, গত মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ২২ জেলার ৩০টি স্থানে অবৈধ তেলের মজুত শনাক্ত করা হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে অবৈধ মজুতদারির বিস্তার ১৭ জেলা থেকে বেড়ে ২২ জেলায় পৌঁছেছে। জনগণের প্রশ্ন—সরকারের নাকের ডগায় বসে রাষ্ট্রীয় তিন কোম্পানি কীভাবে এই সংকটময় মুহূর্তে ডিলারদের হাতে এত বিপুল পরিমাণ তেল তুলে দিল?