দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বন্দী অবস্থান করায় সার্বিক কারা ব্যবস্থাপনা এখন মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। অনুমোদিত আসনের তুলনায় বিপুলসংখ্যক কয়েদি ও বিচারাধীন আসামির চাপে জেলখানাগুলোতে চরম স্থানসংকট, দমবন্ধ পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবার মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, গাদাগাদি করে কয়েদিদের রাখার ফলে কারাগারের ভেতরে মৌলিক মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং দিন দিন এক অমানবিক পরিস্থিতি স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট ৭৪টি কারাগারে সর্বসাকুল্যে ৪৫ হাজার ২৮৬ জন বন্দী রাখার আনুষ্ঠানিক সক্ষমতা রয়েছে। অথচ বাস্তবে সেখানে অবস্থান করছেন ৯৬ হাজার ৭৭৩ জন বন্দী। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি মানুষকে এসব সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ঢাকা ও কাশিমপুর কমপ্লেক্সসহ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় কারাগারগুলোতে, যেখানে নির্ধারিত সীমার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি বন্দী গাদাগাদি করে দিন কাটাচ্ছেন। ৪ হাজার ৫৯০ জন ধারণক্ষমতার ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে ১২ হাজারের বেশি এবং কাশিমপুরের বিভিন্ন ইউনিটে নির্ধারিত সংখ্যার তিন গুণ বেশি কয়েদি অবস্থান করছেন।
আইন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই অস্বাভাবিক কয়েদি জটের পেছনে প্রধান কারণ হলো বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, নিয়মিত জামিন পাওয়ার জটিলতা, জামিন লাভের পরপরই পুরোনো বা নতুন মামলায় ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখানো এবং সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপী চালানো বড় ধরনের গণগ্রেপ্তার অভিযান। কারাগারের মোট বন্দীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই বিচারাধীন মামলার আসামি, যাদের কোনো আনুষ্ঠানিক সাজা হয়নি এবং তাদের ভাগ্য আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলে রয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা মাত্র ৩১ হাজারের কাছাকাছি, যার মধ্যে দুই হাজার ৫৮০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি রয়েছেন। মাদক মামলা, নারী ও শিশু নির্যাতন, বিস্ফোরক, হত্যা ও বিশেষ ক্ষমতার মামলার আসামিদের ভিড়েই মূলত কারাগারগুলো পূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারাভ্যন্তরে স্থানসংকটের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার সুযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ জেলা ও কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থায়ী চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকায় অসুস্থ বন্দীদের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এছাড়া সাধারণ রেশনের খাবারের মান নিয়ে বন্দীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থাকলেও অর্থের বিনিময়ে ভেতরে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা কেনাবেচার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। প্রিজনার ক্যাশ বা পিসি অ্যাকাউন্টে জমা থাকা অর্থ এবং নগদ লেনদেনের মাধ্যমে উন্নত খাবার, আরামদায়ক থাকার জায়গা, আত্মীয়দের সাথে বিশেষ সাক্ষাৎ এমনকি অবৈধভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে কারাগার থেকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
কারা কর্তৃপক্ষ অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনি সংস্কার, ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ওপর জোর দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ভিআইপি বন্দীদের জন্য বিশেষ ভবন, রোহিঙ্গা বন্দীদের জন্য উখিয়ায় আলাদা বন্দিশালা এবং মাদক মামলার আসামিদের জন্য বিশেষায়িত কেন্দ্র চালুর কাজ চলছে। এছাড়া আর্থিক অনিয়ম ও মোবাইল ব্যবহারের মতো অপরাধ বন্ধে উন্নত স্ক্যানার ও আধুনিক জ্যামার স্থাপনের পাশাপাশি পিসি অ্যাকাউন্টে অর্থ জমার সীমা নির্ধারণ এবং ডিজিটাল নগদহীন লেনদেন চালুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল নতুন কারাগার বানিয়ে এই বহুমুখী সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় গ্রেপ্তার বন্ধ, ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে বিচারাধীন আসামিদের মুক্তির পথ সুগম করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।