রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত নাগরিক জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে নিঃশব্দে এক গভীর সামাজিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আর জীবিকার সন্ধানে গড়ে ওঠা এই মেগাসিটিতে পারিবারিক কাঠামোর ভিত্তি ক্রমেই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া বিবাহবিচ্ছেদের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দাম্পত্য সম্পর্কের এক অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও স্পর্শকাতর বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়। প্রশাসনিক পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চুয়াল্লিশটি সংসার ভেঙে যাচ্ছে, যার অর্থ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় দুটি করে বৈবাহিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটছে। একক পরিবারের বিস্তার, তীব্র মানসিক চাপ এবং পারস্পরিক আস্থার অভাব নগরবাসীর জীবনকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে ঠেকিয়েছে, যেখানে বিচ্ছেদই হয়ে উঠছে আপাত সংকট নিরসনের প্রধান উপায়। যৌথ পরিবারের চিরায়ত সহমর্মিতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি আধুনিক নগরায়ণের বহুবিধ অভিঘাত এখন সরাসরি আঘাত হানছে গৃহকোণে।
ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত নথি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিচ্ছেদের এই প্রবণতা ভৌগোলিক অঞ্চলভেদেও কিছুটা ভিন্ন মাত্রা ধারণ করেছে। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সংসার ভাঙার হার উত্তর সিটি করপোরেশনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ঢাকা দক্ষিণে সাত হাজার পাঁচশো চৌদ্দটি তালাক চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়েছে, যার গড় হিসাব করলে দেখা যায় সেখানে প্রতিদিন প্রায় আটাশটি করে দাম্পত্যের ইতি ঘটছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটিতে বছরের প্রথম ছয় মাসের তথ্যানুযায়ী দুই হাজার আটশো একান্নটি তালাক কার্যকর হয়েছে, যেখানে দৈনিক গড়ে ভাঙছে প্রায় ষোলোটি পরিবার। শতাংশের বিচারে উত্তরের চেয়ে দক্ষিণ সিটি এলাকায় তালাকের হার প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ বেশি। বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিক খতিয়ানও এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে স্পষ্ট করে তোলে। ২০২৩ সালে দক্ষিণে সাত হাজার পাঁচশো ত্রিশটি, ২০২৪ সালে সাত হাজার ছয়শো পঁচানব্বইটি এবং ২০২৫ সালে আট হাজার একশো চুয়াত্তরটি তালাক কার্যকর হয়েছিল। উত্তরেও একই ধারা বিদ্যমান; ২০২৩ সালে সেখানে পাঁচ হাজার দুশো ত্রিশটি, ২০২৪ সালে পাঁচ হাজার তিনশো পাঁচটি এবং ২০২৫ সালে পাঁচ হাজার তিনশো ছাব্বিশটি আবেদন কার্যকর পরিণতির দিকে গেছে।
পরিসংখ্যানের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, আইনের বিধান মেনে সিটি করপোরেশনে তালাকের নোটিশ পৌঁছানোর পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার তিক্ততা নিরসনের সম্ভাবনা একেবারেই শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী বিচ্ছেদের নোটিশ কার্যকর হওয়ার আগে নব্বই দিনের একটি বাধ্যতামূলক অপেক্ষার সময় রাখা হয়, যাতে উভয় পক্ষকে ডেকে পারস্পরিক মধ্যস্থতা ও পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেওয়া যায়। অথচ বাস্তব চিত্র বলছে, এই সমঝোতা প্রক্রিয়া প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দুই সিটিতে জমা পড়া মোট আবেদনের মাত্র পাঁচ দশমিক সাতাশী শতাংশ ক্ষেত্রে আপস বা সংসার টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। বাকি বিপুলসংখ্যক আবেদনই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী বিচ্ছেদে রূপ নিচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা। অনেক ক্ষেত্রে তালাকের নোটিশে স্বামী কিংবা স্ত্রীর ঠিকানা ভুল বা অসম্পূর্ণ দেওয়া হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাঠানো আপস আলোচনার চিঠি যথাযথ ব্যক্তির কাছে পৌঁছায় না অথবা দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যায়। এতে করে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর যে সামান্য সুযোগটুকু সংবিধিবদ্ধ ছিল, তাও কার্যত ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান সময়ের বিচ্ছেদ চিত্রে সবচেয়ে দৃশ্যমান ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক মাত্রায় এগিয়ে থাকা। তথ্যানুযায়ী, পুরুষের তুলনায় নারীদের পক্ষ থেকেই বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আবেদন আসছে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দুই সিটি করপোরেশনের মোট তেতাল্লিশ হাজার দুশো ছেষট্টিটি কার্যকর ও প্রক্রিয়াধীন আবেদনের মধ্যে নারীর পক্ষ থেকে জমা পড়েছে উনত্রিশ হাজার দুশো আটানব্বইটি, বিপরীতে পুরুষদের আবেদনের সংখ্যা মাত্র তেরো হাজার নয়শো আটষট্টিটি। অর্থাৎ পুরুষের চেয়ে নারীদের তালাক দেওয়ার হার প্রায় একশো নয় দশমিক ছয় শতাংশ বা দুই দশমিক এক গুণ বেশি। অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণেও একই চিত্র দেখা যায়; দক্ষিণ সিটিতে কার্যকর হওয়া তেইশ হাজার তিনশো নিরানব্বইটি তালাকের মধ্যে ষোলো হাজার আটশো আটচল্লিশটি এসেছে স্ত্রীর পক্ষ থেকে এবং উত্তরে জমা পড়া উনিশ হাজার আটশো সাতষট্টিটি আবেদনের মধ্যে বারো হাজার চারশো পঞ্চাশটির আবেদনকারী নারী।
নারীদের পক্ষ থেকে বিপুল সংখ্যায় বিচ্ছেদের আবেদন আসার পেছনে সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হয়ে ওঠাকে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করছেন। অতীতে গ্রামীণ কিংবা রক্ষণশীল মানসিকতার পরিবারগুলোতে নির্যাতনের শিকার হয়েও নিছক অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে বহু নারী বাধ্য হয়ে মুখ বুজে সংসার টিকিয়ে রাখতেন। কিন্তু বর্তমানের নগরায়িত বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত স্বাধীনতার কারণে নারীরা নিজেদের নাগরিক অধিকার ও আত্মসম্মানবোধ সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। তারা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অবমাননা, অসম্মান ও শারীরিক নির্যাতনকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা এটিকে কেবল একটি সংকীর্ণ পারিবারিক ভাঙন হিসেবে না দেখে সমাজের ইতিবাচক রূপান্তর হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন। কোনো নারী যখন পারিবারিক সহিংসতার মুখে দীর্ঘ অবহেলার জীবন পেছনে ফেলে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সাহস দেখান, তখন তা মূলত আত্মরক্ষামূলক সামাজিক প্রতিবাদেরই প্রতিফলন।
সাধারণত সিটি করপোরেশনের দাপ্তরিক নথিতে তালাকের কারণ হিসেবে এক বা দুই শব্দে ‘মনের অমিল’ কথাটি লিখে দেওয়া হয়। কিন্তু এই সাধারণ শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বহুবিধ পারিবারিক ও সামাজিক সংঘাত। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত বারোটি প্রধান কারণে এই বিচ্ছেদগুলো ঘটছে। এর মধ্যে রয়েছে অব্যাহত শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও জীবিকার সংকট, স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করা, স্বামীর অতিরিক্ত যৌতুক দাবি এবং দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকার কারণে তৈরি হওয়া দূরত্ব। এ ছাড়া সন্দেহপ্রবণতা, পরিবারের অভ্যন্তরীণ অহেতুক হস্তক্ষেপ, একে অপরকে সময় না দেওয়া এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাবের মতো মানসিক বিষয়গুলো সংসারজীবনকে বিষাক্ত করে তুলছে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও ভার্চুয়াল জগতের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারও নগরের দাম্পত্য কলহকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত আসক্তি স্বামী-স্ত্রীর দৈনন্দিন যোগাযোগকে সংকুচিত করে তুলছে। একই ছাদের নিচে পাশাপাশি বসে থেকেও ভার্চুয়াল স্ক্রিনে নিমগ্ন থাকার ফলে মানসিক নৈকট্য নষ্ট হচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা। এর সূত্র ধরে সামাজিক মাধ্যমে পুরনো সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন কিংবা নতুন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সরাসরি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা আইনি নথিতে অনেক সময় অপ্রকাশিত থাকলেও, এই গোপন সম্পর্কের জের ধরে সৃষ্ট তীব্র অবিশ্বাস ও পারিবারিক বিরোধ শেষ পর্যন্ত সংসারকে খাদের কিনারায় নিয়ে ফেলছে। একই সঙ্গে নগরজীবনে মাদকের বিস্তার দাম্পত্য জীবনে আরেকটি ধ্বংসাত্মক বিষফোড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাদকাসক্তির ফলে ব্যক্তির ভেতরে চরম দায়িত্বহীনতা, আর্থিক অপচয় ও উগ্র হিংস্রতার জন্ম নিচ্ছে, যা প্রতিনিয়ত নিরপরাধ সঙ্গীকে অসহনীয় শারীরিক নির্যাতনের শিকার বানাচ্ছে এবং চূড়ান্ত পরিণাম হিসেবে সংসারটি ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
দাম্পত্য বিচ্ছেদের এই ভয়াবহ ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও অরক্ষিত হয়ে পড়ছে নিষ্পাপ সন্তানেরা। একটি সংসার ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে শিশুর মানসিক নিরাপত্তা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুস্থ পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। কার কাছে থাকবে, কে বহন করবে পড়াশোনার খরচ, কিংবা ভবিষ্যতে সমাজের চোখে কেমন দৃষ্টিভঙ্গির মুখোমুখি হতে হবে—এই জাতীয় টানাপড়েন শিশুদের গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা ও সমাজবিমুখতার জন্ম নেয়, যা তাদের পরিণত জীবনের মনস্তত্ত্বকেও স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে পারিবারিক সহিংসতা কিংবা চরম বিষাক্ত সম্পর্কের মধ্যে শিশুদের বড় করার চেয়ে সুস্থ বিচ্ছেদকে অনেকে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর মনে করলেও, সন্তানহীনতার এই শূন্যতা এবং নিঃসঙ্গ শৈশব কোনোভাবেই পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয় না।
সমাজবিশ্লেষকদের অভিমত, রাজধানীতে বিচ্ছেদের এই ঊর্ধ্বমুখী সূচক কেবল আইনগত পরিসংখ্যান নয়, এটি নগরজীবনের চরম ব্যস্ততা, ক্রমবর্ধমান হতাশা এবং মানসিক সহনশীলতার চরম পতনের এক স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী মানুষ যখন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠেন এবং ব্যক্তিগত অহংবোধকে প্রাধান্য দেন, তখন পারিবারিক বোঝাপড়ার জায়গাটি সংকুচিত হয়ে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল শিক্ষা ও জীবিকার প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়াই বিচ্ছেদের মূল উৎস নয়; বরং পারস্পরিক ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং যেকোনো সংকটে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যে মানবিক গুণাবলী, সেগুলোর অভাবেই আজ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মতানৈক্যও বিচ্ছেদের মতো চরম সিদ্ধান্তে মোড় নিচ্ছে। এই অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়ার আগেই প্রাতিষ্ঠানিক পারিবারিক কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যা এবং পারস্পরিক সহমর্মিতামূলক মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ