• বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪৪ অপরাহ্ন
Headline
ঋণের পাহাড় ও শূন্য থলের আখ্যান: চরম অর্থকষ্টে কোন পথে বাংলাদেশ? ফখরুলের ‘ক্লান্তি’: স্বেচ্ছায় বিদায় নাকি ‘মাইনাস’? জাতীয় সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হলে যেসব সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় খাদের কিনারে অর্থনীতি: ড. ইউনূসের আমল নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন নাহিদার ঘূর্ণিও বৃথা: ব্যাটারদের ব্যর্থতায় হারল বাংলাদেশ পেপ্যাল আসছে, জানালেন প্রধানমন্ত্রী ‘স্মার্ট কৃষি’ নিয়ে একগুচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিকের শিশুদের বিনামূল্যে জুতা: সরকারের আর কী চমক থাকছে? উর্দুভাষী বাংলাদেশিদের স্থায়ী পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে: প্রধানমন্ত্রী বাস ভাড়া না বাড়ানোর নির্দেশ

নতুন সরকারের বিশাল কেনাকাটার ফর্দ: প্রয়োজনীয়তা বনাম অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতা

Reporter Name / ৪৪ Time View
Update : সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

নতুন সংসার শুরু করার প্রথম মাসে যেমন হিসাব ছাড়া চাল, ডাল থেকে শুরু করে ফ্রিজ, টিভি কেনাকাটার হিড়িক পড়ে, ঠিক তেমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখি এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মধ্যেই দেশের জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুরু হয়েছে বিপুল অঙ্কের কেনাকাটা। সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে জনকল্যাণমূলক। কিন্তু মাসের শেষে বেতনের চেক আর খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে যেমন হোঁচট খেতে হয়, দেশের অর্থনীতির খাতা মেলাতে গিয়েও এখন উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই বিপুল ব্যয়ের ধাক্কা সামলাবে কে?


কী কী কিনছে সরকার?

গত ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় একের পর এক বড় কেনাকাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এক নজরে সরকারের সাম্প্রতিক কেনাকাটার উল্লেখযোগ্য খাতগুলো:

  • জ্বালানি খাত (এলএনজি): মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম চড়া হলেও বিদ্যুৎ ও শিল্প সচল রাখতে স্পট মার্কেট থেকে ৩ কার্গো (৩৩.৬০ লাখ এমএমবিটিইউ) এলএনজি কেনা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের টোটাল এনার্জি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো ইন্টারন্যাশনালের কাছ থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে এই গ্যাস কিনতে খরচ হচ্ছে ২,৬৫৪ কোটি টাকারও বেশি

  • বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো: সিদ্ধিরগঞ্জের (২x১২০ মেগাওয়াট) গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৩,৮৮০ কোটি টাকা। পাশাপাশি, তিস্তা নদীর ওপর ১,৪৯০ মিটার দীর্ঘ সুন্দরগঞ্জ-চিলমারী সেতু নির্মাণে সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা

  • খাদ্য নিরাপত্তা ও নিত্যপণ্য: * ভারত থেকে আন্তর্জাতিক দরপত্রে ৫০ হাজার মেট্রিক টন নন-বাসমতি চাল (প্রায় ২১৭ কোটি টাকা)।

    • পাকিস্তান থেকে আরও ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল এবং রাশিয়া থেকে বড় চালানে গম আমদানি।

    • টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের জন্য স্থানীয় কোম্পানি থেকে ৩০৫ কোটি ৫৬ লাখ ৮০ হাজার টাকায় ১.৮ কোটি লিটার রাইস ব্র্যান তেল ক্রয়। এছাড়া বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেল, চিনি এবং প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনা হচ্ছে।

  • কৃষি খাত: চাষাবাদের মৌসুমকে সামনে রেখে মরক্কো, তিউনিশিয়া, সৌদি আরব, রাশিয়া এবং দেশীয় কোম্পানি কাফকো থেকে মোট ২ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন বিভিন্ন সার (টিএসপি, ইউরিয়া, এমওপি) কেনা হচ্ছে।

  • প্রতিরক্ষা খাত: যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক বাণিজ্য চুক্তি, জাপানের সাথে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ইতালির কাছ থেকে ‘ইউরো ফাইটার টাইফুন’ যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।


অর্থনীতির হিসাব: আয় বনাম ব্যয়

সরকারের এই কেনাকাটার ফর্দ যোগ করলে তা কয়েক লক্ষ কোটি টাকার প্রকল্প ও চুক্তিতে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অর্থনীতির সহজ সূত্র হলো আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রাখা।

  • বাণিজ্য ঘাটতি: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু একই সময়ে আমদানির পরিমাণ বেশি হওয়ায় প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, দেশ যা আয় করছে তার চেয়ে বেশি খরচ করে ফেলছে।

  • রিজার্ভের ওপর চাপ: সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশের গ্রস রিজার্ভ প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার এবং ব্যবহারযোগ্য কার্যকর রিজার্ভ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। আমদানির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকলে এবং রপ্তানি না বাড়লে রিজার্ভের ওপর মারাত্মক চাপ পড়বে।

সামনের দিনের চ্যালেঞ্জ

অবশ্য সরকারের এই কেনাকাটার বড় অংশই কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার প্রয়োজন। গ্যাস বা সার না কিনলে বিদ্যুৎ ও কৃষি স্থবির হয়ে পড়বে; বাজারে পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হবে। তাই একদিকে জনস্বার্থ, অন্যদিকে অর্থনীতির ভারসাম্য—এই দুয়ের মাঝে এক কঠিন দড়ি টানাটানির খেলা খেলছে সরকার।

তবে অর্থনীতির ইতিহাস সতর্ক করে যে, আয় থেকে ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেশি হলে ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ অবশ্যম্ভাবী। এখন দেখার বিষয়, বিপুল এই কেনাকাটার বিপরীতে সরকার রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়াতে কতটা সফল হয়। তা না হলে, অর্থনীতির হিসাবের খাতায় ‘লাল কালি’র আঁচড় পড়াটা হয়তো সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category