• শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৬ অপরাহ্ন

নিয়োগ বিধির গোলকধাঁধায় চাকরিপ্রার্থীরা: বারবার সিদ্ধান্তে বদল, বাড়ছে ক্ষোভ

Reporter Name / ২ Time View
Update : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের যুবসমাজের কাছে সরকারি চাকরি কেবল জীবিকার একটি মাধ্যম নয়, বরং একটি সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক নিরাপত্তার দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন| দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বিশাল অংশ বছরের পর বছর যাবতীয় সামাজিক যোগাযোগ ও আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে নিজেদের উৎসর্গ করে| প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার দীর্ঘ ও জটিল বৈতরণী পেরিয়ে যখন একজন প্রার্থী চূড়ান্ত সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছান, তখন প্রশাসনিক কোনো অবিবেচক সিদ্ধান্তে নিয়োগ আটকে যাওয়া কিংবা মাঝপথে নিয়ম বদলে দেওয়ার আশঙ্কা তাদের জীবনে এক চরম মানসিক যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তা ডেকে আনে| এমনই এক সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মাত্র আট মাসের ব্যবধানে চাকরি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্ম দিয়েছে| প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, কোনো পূর্বাপর বিবেচনা ছাড়াই হঠাৎ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, যা ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আন্দোলন দানা বেঁধেছে| পরবর্তীতে সেই আন্দোলন ও সমালোচনার মুখে পড়ে সরকারকে নিজেদের অবস্থান থেকে পিছু হটতে হয়েছে, যা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দূরদর্শিতা ও সক্ষমতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে|

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তরুণরা যখন চাকরির বাজারে প্রবেশ করে, তখন তাদের এক চরম অসম ও নির্মম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়| বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বিসিএস পরীক্ষার মতো উচ্চ প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষায় লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হয়| এখানে প্রতিটি ধাপই এক একটি কঠিন অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে সামান্য ভুলের কারণে যেকোনো একটি ধাপ থেকে বাদ পড়া মানেই পুরো দুই-তিন বছরের সংগ্রামকে শূন্য থেকে পুনরায় শুরু করা| অথচ মেধার স্বাক্ষর রেখে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভায় উত্তীর্ণ হয়ে যখন প্রার্থীরা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন বা পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেন, তখন তাদের সামনে আবির্ভূত হয় ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’ নামের এক অদৃশ্য ও অনিয়ন্ত্রিত চতুর্থ ধাপ| এই ধাপে প্রার্থীর মেধা বা যোগ্যতার কোনো ভূমিকা থাকে না, তাকে সম্পূর্ণভাবে ভাগ্য ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করতে হয়|

অতি সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে এই ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার এক নগ্ন ও হতাশাজনক রূপ প্রকাশ পায়| পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত ৬৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়| এতে দেখা যায়, কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা কারণ দর্শানো ব্যতিরেকেই সরাসরি বাদ দেওয়া হয় ৫৭ জন চূড়ান্ত উত্তীর্ণ প্রার্থীকে| আরও মর্মান্তিক বিষয় হলো, নিজ নিজ বিষয়ে মেধা তালিকার শীর্ষে অবস্থান করা এক নম্বর প্রার্থীর নাম গেজেট থেকে বাদ দিয়ে সরাসরি দুই নম্বর মেধাক্রমের প্রার্থী থেকে তালিকা শুরু করা হয়| মেধার এমন চরম অবমূল্যায়নে দেশজুড়ে সমালোচনার তীব্র ঝড় ওঠে এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা চাকরিতে দলীয়করণ ও ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি বন্ধের দাবিতে রাজপথে নামেন| তীব্র প্রতিবাদের মুখে সরকার নতিস্বীকার করে এবং গত ৫ অক্টোবর রাতে বাদ পড়া ৫৭ জনের মধ্যে আরও ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে সম্পূরক প্রজ্ঞাপন জারি করতে বাধ্য হয়, যার আগাম আভাস দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ| একজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ না থাকলে কেবল রাজনৈতিক বা গোয়েন্দা তথ্যের ধোঁয়াশা তুলে তাকে নিয়োগবঞ্চিত করার এই অনৈতিক সংস্কৃতি রাষ্ট্রের সার্বিক নিয়োগব্যবস্থার ওপর তরুণ প্রজন্মের চরম অনাস্থা তৈরি করছে|

বিসিএসের এই বিতর্ক কাটতে না কাটতেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও তৈরি হয় অবিকল একই ধরনের সংকট| গত সেপ্টেম্বরের শেষভাগে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে প্রায় দুই হাজার উত্তীর্ণ প্রার্থীকে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়| দীর্ঘ প্রস্তুতি ও মেধার লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়ার পর যখন নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার কথা, তখন এই বিপুলসংখ্যক প্রার্থীকে রাজপথে নেমে অনশন ও সড়ক অবরোধের মতো চরম কর্মসূচিতে যেতে হয়| প্রার্থীদের অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দলীয় আনুগত্যের অজুহাতে ভেরিফিকেশনের ছাঁকনি দিয়ে তাদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করা হয়েছে| রাজপথের তীব্র গণবিক্ষোভ ও ক্ষোভের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সরকার অবশেষে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার আনুষ্ঠানিক আশ্বাস দেয় এবং পরবর্তীতে বাদ পড়া সেই সব প্রার্থীদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে|

প্রশাসনিক এই অস্থিরতার ঢেউ কেবল সরকারি চাকরিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আছড়ে পড়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগেও| বিগত কয়েক বছর ধরে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ বা এনটিআরসিএর মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে মেধার ভিত্তিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের যে স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়| গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ বৈঠকে শিক্ষক নিয়োগের একক ক্ষমতা পুনরায় স্থানীয় পরিচালনা পর্ষদ বা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ন্যস্ত করার বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়| এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশজুড়ে চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষাবিদদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে| সবার আশঙ্কা ছিল, ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগ ক্ষমতা ফিরে গেলে মেধার কোনো স্থান থাকবে না; বরং স্থানীয় পর্যায়ে অর্থ লেনদেন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে শিক্ষক পদ বেচাকেনার পুরোনো অন্ধকার যুগ ফিরে আসবে| ছাত্র ও যুবসমাজের তুমুল প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে, পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী এনটিআরসিএর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমেই শিক্ষক নিয়োগ অব্যাহত থাকবে|

একের পর এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা প্রত্যাহারের এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেই সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার পদ্ধতিগত কাঠামো নিয়ে নতুন এক বিতর্ক সামনে নিয়ে আসা হয়েছে| সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দপ্তরের ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভাইভা পরীক্ষার নম্বর আশঙ্কাজনক হারে বাড়িয়ে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে| গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় প্রক্সি ও জালিয়াতি ঠেকানোর যুক্তি দেখিয়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর সমান অর্থাৎ ৫০-৫০ করার একটি বিধিমালার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়| সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে নিয়োগের মানোন্নয়ন ও যোগ্য জনবল নির্বাচনের প্রক্রিয়া বলে দাবি করা হলেও সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের মনে গভীর সন্দেহ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে| তাদের যুক্তি অত্যন্ত পরিষ্কার—লিখিত পরীক্ষা হলো একটি দৃশ্যমান, কাঠামোবদ্ধ ও মেধা যাচাইয়ের বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতি; বিপরীতে ভাইভা বোর্ডে বিপুল নম্বর বরাদ্দ রাখলে সেখানে ব্যক্তিবিশেষের প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক বিবেচনা ও দুর্নীতির অবাধ সুযোগ তৈরি হবে|

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বেকারত্ব যখন একটি জাতীয় সংকট, তখন নিয়োগব্যবস্থায় এমন ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্থিরতা তরুণ সমাজের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দিচ্ছে| একটি শূন্য পদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে আবেদন, পরীক্ষা এবং চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত একজন প্রার্থীর জীবনের মূল্যবান কয়েক বছর নিঃশেষ হয়ে যায়| এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাঝপথে বারবার নিয়ম পরিবর্তন কিংবা চূড়ান্ত সুপারিশের পর অযৌক্তিকভাবে প্রার্থীদের ছাঁটাই করা চরম অবিবেচনাপ্রসূত| নীতিনির্ধারকদের যেকোনো সংস্কার বা পরিবর্তন আনার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজন, শিক্ষাবিদ এবং খোদ চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করা অপরিহার্য ছিল| কিন্তু তা না করে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া এবং পরবর্তীতে রাজপথের আন্দোলনের মুখে তা প্রত্যাহার করার এই প্রবণতা সরকারের প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দুর্বল নীতিকেই জনসমক্ষে উন্মোচিত করছে| রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে অবিলম্বে এমন অস্থিরতা বন্ধ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক একটি স্থায়ী নিয়োগব্যবস্থা কায়েম করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি|

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category