দৈনন্দিন জীবনে জ্বর বা যেকোনো শারীরিক ব্যথায় আমাদের প্রথম ভরসার নাম প্যারাসিটামল। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই খুব সহজে ও কম দামে পাওয়ায় এই ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের সমাজে এক সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মাত্রায় এটি অত্যন্ত নিরাপদ হলেও, প্যারাসিটামল নিয়ে মানুষের মধ্যে থাকা বেশ কিছু ভুল ধারণা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনছে। অনেকেই মনে করেন, এই ওষুধটির কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এবং দ্রুত জ্বর কমাতে এটি ইচ্ছেমতো খাওয়া যায়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত প্যারাসিটামল সরাসরি আমাদের লিভারের ওপর ভয়ানক চাপ সৃষ্টি করে তা স্থায়ীভাবে বিকল করে দিতে পারে। এছাড়া, এটি খালি পেটে খাওয়া যায় না কিংবা এর সঙ্গে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেতে হয়—এমন ধারণাও সম্পূর্ণ ভুল, কারণ অন্যান্য ব্যথানাশকের মতো এটি অ্যাসিডিটি তৈরি করে না।
প্যারাসিটামলের সবচেয়ে বড় বিপদটি লুকিয়ে থাকে অন্যান্য ওষুধের সাথে এর বিপজ্জনক বিক্রিয়ার মধ্যে। অনেক সময় আমরা সাধারণ সর্দি-কাশি বা শরীর ব্যথার জন্য ফার্মেসি থেকে বিভিন্ন নামের ওষুধ কিনে খাই, যার প্রায় প্রতিটিতেই প্যারাসিটামল মিশ্রিত থাকে। ফলে অজান্তেই আমাদের শরীরে প্যারাসিটামলের মাত্রা বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘হিডেন ওভারডোজ’ বলা হয়। এছাড়া যারা নিয়মিত রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা ব্লাড থিনার সেবন করেন, তারা দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমাত্রায় প্যারাসিটামল খেলে শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক সমস্যার ওষুধের সাথে প্যারাসিটামল সেবন করাটা রীতিমতো আত্মঘাতী হতে পারে। যেমন, মৃগীরোগ নিরাময়ের ওষুধ (কার্বামাজেপিন, ফেনাইটোইন) কিংবা যক্ষ্মার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ (আইসোনিয়াজিড) সেবনকালে প্যারাসিটামল খেলে তা শরীরে বিষাক্ত উপাদান তৈরি করে লিভারের কোষগুলোকে দ্রুত ধ্বংস করে দেয়। এর পাশাপাশি সবচেয়ে ভয়ংকর সংমিশ্রণটি ঘটে অ্যালকোহলের সাথে। যারা নিয়মিত অ্যালকোহল পান করেন, তাদের ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল লিভার বিকল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, কারণ উভয় উপাদানই সরাসরি লিভারে গিয়ে বিপাক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় এবং অঙ্গটির ওপর অসহনীয় চাপ ফেলে।
তাই এই জীবনদায়ী ওষুধটির সঠিক ব্যবহারবিধি সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকদের মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৬ গ্রাম প্যারাসিটামল গ্রহণ করতে পারেন, তবে জ্বর টানা দুই দিনের বেশি স্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে আন্দাজে বড়দের ওষুধ ভেঙে খাওয়ানো চরম ঝুঁকিপূর্ণ; তাদের ডোজ নির্ধারণ করতে হবে নিখুঁতভাবে ওজনের ওপর ভিত্তি করে। সর্বোপরি, শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে থাকলে হুটহাট ওষুধ না খেয়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, জলপট্টি বা হালকা ঠান্ডা পানিতে শরীর মুছে দেওয়ার মতো প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরই ভরসা রাখা উচিত।