২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের রাজপথ কাঁপানো জেন-জি প্রজন্মের আন্দোলন বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। সেই আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রতিবেশী দেশ নেপালে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের আন্দোলনকারীদের মনে একইসাথে ঈর্ষা ও আক্ষেপের জন্ম দিয়েছে। নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক র্যাপার বালেন্দ্র শাহের শপথ গ্রহণ এবং পার্লামেন্টে একঝাঁক তরুণ আইনপ্রণেতার উপস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বিরল অধ্যায় যোগ করেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের তরুণরা রাজপথের আন্দোলনকে সফলভাবে নির্বাচনী শক্তিতে রূপান্তর করতে পেরেছে। মাত্র চার বছরের পুরনো দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) এবং বালেন্দ্র শাহের জোট গত নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আশানুরূপ ফল পায়নি।
আন্দোলনকারী উমামা ফাতেমা তাঁর হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “নেপালের তরুণরা যেভাবে নিজেদের সংগঠিত করে শাসনে অংশ নিয়েছে, আমরা সেভাবে দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগটি কাজে লাগাতে পারিনি।”
বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের সাফল্যের পেছনে ছিল কয়েকটি কৌশলগত কারণ: ১. রাজনৈতিক শূন্যতা: গত ১৭ বছরে ১৪টি সরকার পরিবর্তনের ফলে নেপালের বড় দলগুলো জনগণের আস্থা হারিয়েছিল। এই ‘মিউজিকেল চেয়ার’ খেলার সুযোগটি নিয়েছে তরুণদের দল আরএসপি। ২. কৌশলগত জোট: বালেন্দ্র শাহের মতো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের সাথে আরএসপির জোট তরুণ ভোটারদের একীভূত করতে সাহায্য করেছে। ৩. দলীয় কাঠামো: তরুণরা আবেগ দিয়ে আন্দোলন করলেও নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন ছিল মজবুত দলীয় কাঠামো, যা নেপালের আরএসপি নিশ্চিত করতে পেরেছে।
বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনে বড় সাফল্য এলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ার পেছনে বিশ্লেষকরা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন:
সময়ের ব্যবধান: নেপালে আন্দোলনের ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন হলেও বাংলাদেশে তা হয়েছে প্রায় দেড় বছর পর। দীর্ঘ সময়ে আন্দোলনের উত্তাপ ও জনসমর্থন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে।
ভুল জোট কৌশল: এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের মতে, এনসিপি আন্দোলনের চেতনার চেয়ে রক্ষণশীল শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতার দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছিল, যা সাধারণ ভোটারদের বিমুখ করেছে।
প্রতিষ্ঠিত শক্তির আধিপত্য: দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক কাঠামোর বিপরীতে নতুন দলগুলো কার্যকর প্রচারণামূলক কৌশলে পিছিয়ে ছিল।
নির্বাচনে প্রত্যাশিত জয় না এলেও বাংলাদেশের তরুণদের আন্দোলন জাতীয় রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। তাদের চাপের মুখে অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের সংবিধান ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে জনগণ। নতুন সরকারও একটি ৩১-দফা সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে।
নেপালের নবনির্বাচিত তরুণ সাংসদ পুরুষোত্তম সুপ্রভাত যাদব ঘোষণা করেছেন, “আমরা রাস্তা থেকে পার্লামেন্টে এসেছি; আমাদের জায়গা বদলেছে কিন্তু লক্ষ্য নয়।” অন্যদিকে, বাংলাদেশের তরুণরা এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। উমামা ফাতেমার মতে, সরকার যদি গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার না করে, তবে প্রয়োজনে ‘জেনারেশন আলফা’ নতুন আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবে।
একনজরে প্রধান কারণসমূহ:
নেপাল: দ্রুত নির্বাচন, মজবুত দলীয় কাঠামো ও সঠিক জোট।
বাংলাদেশ: দীর্ঘ প্রতীক্ষা, রাজনৈতিক কৌশলে ঘাটতি ও প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর শক্তিশালী অবস্থান।
নেপালের এই উত্থান প্রমাণ করেছে যে, শুধু সরকার পতন নয়, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে রাজপথের আন্দোলনকারীরাই হয়ে উঠতে পারে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য নেপাল এখন এক বড় রাজনৈতিক শিক্ষা।