অবশেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘পদ্মফুল’ হয়তো ফুটতে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই ছিল যেকোনো উপায়ে পশ্চিমবঙ্গ দখলে নেওয়া। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বুথফেরত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস হয়তো ক্ষমতা হারাতে যাচ্ছে এবং সেখানে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার গঠন করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের এই বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে বড় আলোচনার ও বিতর্কের বিষয় ছিল S.I.R. (Special Intensive Revision) বা ভোটার তালিকা সংশোধন। ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে এত বিতর্ক আর কখনো হয়নি।
তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, তাদের মূল ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতেই কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এই সংশোধনের ফলে মোট ভোটারের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ কমে যায় এবং ভোটার সংখ্যা আনুমানিক ৬ কোটির কিছু বেশিতে নেমে আসে। এবারের নির্বাচনে মূল ইস্যুগুলোর মধ্যে ছিল দুর্নীতি, অনুপ্রবেশ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়।
যদি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করে, তবে তা শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় থাকবে না, বরং তা বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সামনে যেমন কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে, তেমনি দেখা দিতে পারে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ।
কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় ও তিস্তা চুক্তি: এতদিন দিল্লিতে বিজেপি এবং পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ক্ষমতায় থাকায় কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে একধরনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পানিবণ্টন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায়। দুই জায়গায় একই দল ক্ষমতায় এলে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ‘তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি’র মতো ইস্যুগুলো দ্রুত এগোতে পারে।
আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ট্রানজিট প্রসার: বাংলাদেশ, ভারত ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য পশ্চিমবঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। সড়ক, রেল ও নৌপথের সংযোগ প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। বিজেপি উভয় জায়গায় ক্ষমতায় থাকলে এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে, যা বাংলাদেশের জন্য ট্রানজিট সুবিধা, বন্দর ব্যবহার ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়ন: বিজেপি সাধারণত ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করে থাকে। তারা ক্ষমতায় এলে সীমান্তকেন্দ্রিক অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার সহজীকরণ হতে পারে।
সীমান্তে অতিরিক্ত কড়াকড়ি: বিজেপি স্বভাবতই সীমান্ত নিরাপত্তার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেয়। পশ্চিমবঙ্গে তারা ক্ষমতায় এলে সীমান্তে কড়াকড়ি ও নজরদারি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। এটি একদিকে অবৈধ কার্যক্রম কমাতে সহায়ক হলেও, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং সীমান্তকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং CAA/NRC ইস্যু: বিজেপির উত্থান মূলত জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল, যার প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কেও পড়তে পারে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC) ইস্যুগুলো নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে। এটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অস্বস্তি ও সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে।
রপ্তানি বাণিজ্যে চাপ: ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ বা স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা নীতির কারণে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত এক দশকে বাংলাদেশ ভারতের সাথে একটি স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যা কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজ্যের রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়। তাই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও বাংলাদেশ তার কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করবে।
একদিকে দিল্লির সাথে সম্পর্ক জোরদার করা, অন্যদিকে সীমান্তবর্তী রাজ্যের সাথে বাস্তবসম্মত সহযোগিতা ধরে রাখা—এটাই হবে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। সংক্ষেপে বললে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সম্ভাব্য ক্ষমতা দখল বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন তিস্তা ও কানেক্টিভিটির মতো ক্ষেত্রে সুযোগ, অন্যদিকে সীমান্ত নীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুর কারণে এক নতুন চ্যালেঞ্জ।