• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৫ অপরাহ্ন
Headline
নবীজির স্মৃতিধন্য জলপাই বাগান দখলে ইসরাইলিরা যত্ন অর্থনীতি বা ‘কেয়ার ইকোনমি’: বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৩ এনসিটিবির উপসচিব-সদস্যসহ আরও ৪ কর্মকর্তাকে বদলি তাহসিফের মৃত্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি রয়েছে: জামায়াত সশস্ত্র বাহিনী বোর্ডের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ফি ১৬৮ টাকা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, অপর তিন আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ড চার বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষক কার্ড দেবে সরকার

পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছে নতুন পর্ষদ

Reporter Name / ১০৬ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

দেশের তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া ও চরম তারল্য সংকটে নিমজ্জিত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসনিক এবং পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ একবারে নয়, বরং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বুঝে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সদ্য গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। একীভূত হওয়ার তালিকায় থাকা এই পাঁচ আমানত সংকটগ্রস্ত ব্যাংকের দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কোনো নির্দিষ্ট নির্দিষ্ট বা বাঁধাধরা সময়সীমা চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। তার বদলে প্রতিটি ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক সামর্থ্য, অনিয়মের মাত্রা, খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমের অগ্রগতি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নতুন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিজেরাই ধাপে ধাপে প্রতিটি ব্যাংকের দায়িত্ব বুঝে নেবে। আর যেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চূড়ান্তভাবে নতুন পরিচালনা পর্ষদের কাছে হস্তান্তরিত হবে, শুধুমাত্র সেই ব্যাংক থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বসানো প্রশাসকদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক এক উচ্চপর্যায়ের নীতি নির্ধারণী বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নতুন ব্যাংকের শীর্ষ পর্ষদের মধ্যে এই যুগান্তকারী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সম্মতি মিলেছে। সোমবারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং ব্যাংক রিজল্যুশন ডিপার্টমেন্টের (বিআরডি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সরাসরি এতে অংশ নেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও আলোচনার সার্বিক সত্যতা সংবাদমাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল কীভাবে ব্যাংকিং খাতের অচল অবস্থা কাটিয়ে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় এবং একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটিকে প্রশাসনিক জটিলতামুক্ত রেখে মসৃণভাবে সম্পন্ন করা যায়।

গৃহীত রূপরেখা অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ সর্বপ্রথম পুনর্গঠনের অধীনে থাকা পাঁচটি ব্যাংকের বর্তমান প্রশাসকদের সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠকে বসবেন। সেখানে প্রতিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ, প্রতিদিনের নগদ তারল্য পরিস্থিতি, আইটি অবকাঠামোর সার্বিক রূপরেখা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা মূল্যায়নের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে ঠিক কোন ব্যাংকটির দায়িত্ব সবার আগে হস্তান্তর করা নিরাপদ হবে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি নিজেদের পর্যালোচনা শেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি বিস্তারিত ও লিখিত দায়িত্ব হস্তান্তর পরিকল্পনা জমা দেবে। সেই সময়সূচির ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে তাদের প্রতিনিধি বা প্রশাসকদের ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করবে। এর অর্থ হলো, আমানতকারীদের বিভ্রান্তি এড়াতে এবং পরিচালনাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পাঁচ ব্যাংক থেকে একসাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসক দল সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না।

এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের একদিন আগে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান নিজেই পৃথকভাবে পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করে বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার তাগিদ দেন। গভর্নর তাঁদের কাছে স্পষ্ট জানতে চান যে, এ মুহূর্তে কোনো ব্যাংক থেকে প্রশাসকদের দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হলে বা হঠাৎ সরিয়ে নেওয়া হলে সার্বিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে কোনো প্রশাসনিক শূন্যতা বা বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে কি না। জবাবে প্রশাসকরা ইতিবাচক আশ্বাস দিয়ে নিশ্চিত করেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের যেকোনো নির্দেশনা বাস্তবায়নে তাঁরা সর্বদা প্রস্তুত রয়েছেন এবং নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নিজেদের প্রশাসনিক কাজ নতুন পর্ষদের হাতে সোপর্দ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফিরে যাবেন। সেই সাথে প্রশাসকরা তাঁদের নিজ নিজ ব্যাংকের বর্তমান পুঞ্জীভূত চ্যালেঞ্জ ও পুনর্গঠনের সার্বিক গতিচিত্র গভর্নরের সামনে উপস্থাপন করেন।

তবে ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ বিশ্লেষক ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একাধিক জ্যেষ্ঠ সূত্রের মতে, এই দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি বাস্তব ক্ষেত্রে কতটা মসৃণ হবে তা নিয়ে বড় ধরণের সংশয় ও উদ্বেগ থেকে যাচ্ছে। বর্তমানে অনিয়মে ডুবে থাকা ওই পাঁচটি ব্যাংকের প্রতিটিতে একজন করে মূল প্রশাসকের পাশাপাশি চারজন করে বিশেষ সহকারী বা সহযোগী কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নিয়োজিত রয়েছেন। অর্থাৎ, প্রতিটি সমস্যায় জর্জরিত ব্যাংকের পুনর্গঠন কার্যক্রম ও অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সামাল দিতে বর্তমানে পাঁচ সদস্যের একটি করে অত্যন্ত দক্ষ প্রতিনিধি দল মাঠে কাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম নজিরবিহীন দুর্নীতি, খেলাপি ঋণের পাহাড়, আমানত ফেরত দিতে না পারার তারল্য সংকট এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসনের মারাত্মক অভাবে ব্যাংকগুলোর যে বেহাল দশা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা খুব সহজ কাজ নয়।

এই কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মাত্র একটি একক পরিচালনা পর্ষদের পক্ষে একই সাথে পাঁচটি ভঙ্গুর ও সংকটাপন্ন ব্যাংকের জটিল কার্যক্রম তদারকি করা কতটা বাস্তবে সম্ভব হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, একের পর এক ব্যাংকের পুঞ্জীভূত সমস্যার পাহাড় এক পর্ষদের ঘাড়ে এসে পড়লে নতুন গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিজেদের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক গতিও চরমভাবে শ্লথ বা ধীরগতির হয়ে পড়তে পারে। যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।

উল্লেখ্য যে, দীর্ঘদিন ধরে তীব্র আমানত সংকট ও ঋণ অনিয়মে অচল হয়ে পড়া এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক— এই পাঁচটি ইসলামী ধারার আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করার মাধ্যমেই মূলত জন্ম নিয়েছে নতুন এই ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’। নতুন এই বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যাত্রা সহজ করতে ইতোমধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল অনুমোদিত মূলধন। কেবল তা-ই নয়, ব্যাংকটির ভঙ্গুর ভিত্তি মজবুত করতে এবং আমানতকারীদের পাওনা মেটাতে সরকার ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশাল মূলধন সহায়তা প্রদান করেছে। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ রাখা হয়েছে ধাপে ধাপে সাধারণ ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের বকেয়া টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য, আর অবশিষ্ট ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারের নিরাপদ সুকুক বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী আয়ের পথ নিশ্চিত করা হয়েছে।

তবে কেবল মূলধন সহায়তা দিলেই যে সমস্যা মিটে যাবে তা নয়, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত একীভূতকরণ বা তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) অবকাঠামোর সমন্বয় সাধন এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ব্যাংকিং খাতের জটিল অনলাইন নেটওয়ার্ক, ডেটাবেজ একীভূতকরণ এবং গ্রাহক তথ্য সুরক্ষার মতো অনেক স্পর্শকাতর কারিগরি কাজ এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। যার ফলে বিদেশি বাণিজ্য, ঋণপত্র বা এলসি খোলা এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কার্যক্রমগুলো এখনো পুরানো ওই পাঁচটি ব্যাংকের আলাদা আলাদা নামেই পরিচালিত করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সম্পূর্ণ আইটি ব্যবস্থা এক ছাতার নিচে না আসা পর্যন্ত এবং ধাপে ধাপে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির পূর্ণাঙ্গ সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category