• বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন

পিটার প্যান সিনড্রোম: আপনার কি চোখে পড়েছে?

বাদল সৈয়দ / ৩ Time View
Update : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

১) কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই-
আমার এক আত্মীয়। বয়সে আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। বিয়ে করেননি। ঢাকায় বিশাল ফ্ল্যাটে দুজন হেল্পিং হ্যান্ড নিয়ে থাকেন।
তাঁর সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়। কথা বলেন মেপে মেপে। একদিন তিনি তাঁর স্বভাবের বাইরে গিয়ে বললেন, ‘বাদল নিঃসঙ্গতা খুব খারাপ। বয়স যখন কম ছিল তখন বুঝিনি। কাজে ব্যস্ত ছিলাম, বন্ধুবান্ধবের হইহুল্লোড় ছিল। এখন সব বাতি একে একে নিভে যাচ্ছে। অফিস নেই, বন্ধুরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কফি হাউজটার আড্ডাটা আজ আর নেই।‘
আমি একটু অবাক হলাম। চিরগম্ভীর মানুষটি আজ কোন ভাষায় কথা বলছেন, বুঝতে পারছি না।
তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘কফি হাউজের আড্ডাটা ভেঙে গেলেও তাদের সবার ঘর আছে, কথা বলার লোক আছে। আমার তা নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় ঝামেলাটায় জড়ালে ভালো হতো।‘
আমি বললাম, ‘ঝামেলা!’
‘বিয়েটাকে ঝামেলা ভেবেছিলাম।‘
আমার মাথায় একটি বাক্য ঝিমঝিম করে বেজে উঠল।
পিটার প্যান সিনড্রোম!
২) গল্পগুলো গল্প নয়-
পিটার প্যান সিনড্রোম কোনো মানসিক রোগ নয় – এক ধরনের আচরণ। কী ধরনের আচরণ?-
ক) বাঘের লেজে কান চুলকানোর ভয় –
আমার আত্মীয় সংসারের দায়িত্ব নিতে ভয় পেয়ে বিয়ে করেননি। তিনি ভেবেছিলেন, সংসার হচ্ছে বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানো। তাই বিয়ে করতে ভয় পেয়েছিলেন।
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে বারবার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া এক ধরনের পিটার প্যান সিনড্রোম।
খ। সামার নামের মেয়েটি –
(500) days of summer সিনেমাটির কথা মনে আছে? টম এবং সামারের ৫০০ দিনের সম্পর্ক নিয়ে সিনেমাটি। যেখানে টম নামের ছেলেটি সামার নামের মেয়েটির সাথে সিরিয়াস সম্পর্ক চায়। কিন্তু সামার সম্পর্ক রাখতে চায়, তবে কোনো কমিটমেন্টে যেতে রাজি নয়।
সম্পর্ক রাখতে চায় কিন্তু দায় নিতে ভয় পায়- এটাও এক ধরনের পিটার প্যান সিনড্রোম।
গ। ম্যান চাইল্ড- উইমেন চাইল্ড-
কিছু পুরুষ বড় হয়েও বালক থেকে যায়। কিছু মেয়ে বড় হয়েও বালিকা থেকে যায়। তারা প্রাপ্তবয়স্কের মতো আচরণ করে না।
বয়স বাড়লেও প্রাপ্তবয়স্কের আচরণ করতে না পারা পিটার প্যান আচরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এরকম আরও আচরণ আছে। সেগুলোতে আর গেলাম না।
৩) কেন হয়?
প্রশ্ন হচ্ছে, পিটার সিনড্রোম সমস্যা কেন হয়?
উত্তর হচ্ছে-
ক) ছোটবেলায় অতিরিক্ত আদর বা Overprotective Parenting.
খ) শৈশবে অবহেলা, অনিরাপদ জীবন।
গ ) শৃঙ্খলাহীন শৈশব – যেখানে দায়িত্ব শেখার সুযোগ থাকে না।
ঘ) ব্যর্থতার জন্য শিশুকালে ক্রমাগত বকাবকি ও অপমান করা।
৪ ) সমাধান?
পিটার প্যান সিনড্রোম যেহেতু কোনো স্বীকৃত মানসিক রোগ নয়, তাই এর নির্দিষ্ট চিকিৎসাও নেই। তবে আচরণে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে এটি কাটানো সম্ভব।
সেগুলো হলো-
ক। ছোট ছোট দায়িত্ব নিয়ে ধীরে বড় দায়িত্বের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
খ। সিদ্ধান্ত ফেলে না রেখে নিয়ে ফেলা।
গ। নিজের ভুল স্বীকার করা।
ঘ। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা। খুব দ্রুত রিয়্যাক্ট না করা।
ঙ) প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানীর সাহায্য নেওয়া।
তবে এর সবচেয়ে বড় সমাধান হলো, শৈশবে যে ব্যাপারগুলো এ সিনড্রোমের জন্ম দেয় বলেছি, সেগুলো ঘটতে না দেওয়া।
আমার সে অবিবাহিত আত্মীয়ের একটি কথা দিয়ে শেষ করি-
‘বাদল, আমরা সবাই ঘামের গন্ধ অপছন্দ করি, কিন্তু জানো, আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কেউ একজন যদি থাকত, বাতাসে যার ঘামের গন্ধ ভেসে আসছে, খারাপ হতো না।’
আচ্ছা, আপনার কি পিটার প্যান সিনড্রোমে ভুগছে এমন কাউকে চোখে পড়েছে?
পাদটীকা: আমি মনোবিজ্ঞানী নই। অভিজ্ঞতা থেকে লিখলাম। বিয়ে না করলেই যে পিটার প্যান সমস্যায় আক্রান্ত তা নয়। অনেকেই হয়তো কোনো বিশেষ কারণে বিয়ে করেন না। কিন্তু অন্য দায়িত্ব ঠিকই পালন করেন।।

#আসুন মায়া ছড়াই


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category