প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো কোনো পরাশক্তির দেশে দ্বিপক্ষীয় সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন চার দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে তিনি চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অবস্থান করবেন। গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর এটিই হতে যাচ্ছে তার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক পদক্ষেপ। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমুখী সম্পর্ক, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং দেশের ভবিষ্যৎ অবকাঠামো উন্নয়নের দিক থেকে এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী এবং অবকাঠামো নির্মাণে সবচেয়ে বড় অর্থায়নকারী দেশ। তাই এই সফরের মাধ্যমে নতুন সরকার কীভাবে চীনের পাশাপাশি ভারত ও জাপানের মতো অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখে, তা স্পষ্ট হবে।
বেইজিং যাওয়ার আগে আগামী ২১ জুন দুই দিনের এক সংক্ষিপ্ত সফরে মালয়েশিয়া যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়া সফরটিই হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফর। তবে মালয়েশিয়া থেকে তিনি সরাসরি চীনে উড়াল দেবেন নাকি দেশে ফিরে এরপর বেইজিং যাবেন, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আজ (বৃহস্পতিবার) দেশে ফেরার পর এই সফরের চূড়ান্ত সূচি নির্ধারিত হবে। এই সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফর থেকে অর্থবহ ও কার্যকর ফলাফল পেতে হলে ঢাকাকে বেশ কয়েকটি কৌশলগত বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প এবং চীনের প্রস্তাবিত তিনটি আন্তর্জাতিক ফ্ল্যাগশিপ ফ্রেমওয়ার্ক— গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই) এবং গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (জিসিআই)।
এই সফরে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত মে মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চীন সফরে গিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করেছিলেন। ওই বৈঠকের পর প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল যে, বাংলাদেশ তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সমর্থন ও সরাসরি অংশগ্রহণ কামনা করেছে। যদিও বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েক বছর ধরে এই প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে, কিন্তু ঢাকা এখনো এতে চীনের চূড়ান্ত অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এর আগে ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পে চীনকে যুক্ত করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু একই বছরের জুন মাসে তার ভারত সফরের পর এই সিদ্ধান্তটি স্থগিত করা হয়। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সেই সময় সিদ্ধান্তটি স্থগিত করার বিষয়টি বেইজিং খুব ভালোভাবে নেয়নি, যার প্রভাব পড়েছিল ওই বছর জুলাইয়ে শেখ হাসিনার চীন সফরের ওপর এবং সেই সফর থেকে প্রত্যাশিত কোনো ফলাফল আসেনি।
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধানে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও উপ-হাইকমিশনার মাহবুব হাসান সালেহ। তিনি বলেন, ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারি পর্যায়ে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করেছিল, কিন্তু ভারতের অনাগ্রহের কারণে গত ১৫ বছরেও তা স্বাক্ষরিত হয়নি। তিনি আরও জানান, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা চাওয়ার পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। ঢাকা এই প্রকল্পের জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে পারে না। ভারত এই বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও তাদের দিক থেকে বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের একটি বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। ভারতের আপত্তি থাকলেও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যে বিকল্পটি সবচেয়ে ভালো, সেটাই বেছে নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
তিস্তা ইস্যুর পাশাপাশি আসন্ন সফরে চীনের প্রস্তাবিত তিনটি বৈশ্বিক উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীন বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে জিডিআই, জিএসআই এবং জিসিআই নামের তিনটি ফ্রেমওয়ার্ক চালু করে। ২০২১ সালে চালু হওয়া জিডিআই-এর লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য বিমোচন, সবুজ উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল কানেক্টিভিটির মাধ্যমে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাহায্য করা। ২০২২ সালে প্রস্তাবিত জিএসআই-তে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সংলাপে জোর দেওয়া হয়েছে, যা মূলত একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো। সবশেষে ২০২৩ সালে চালু হওয়া জিসিআই-এর মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বৃদ্ধি এবং নিজ নিজ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী উন্নয়নের স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার সফরের সময় এই তিন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হলেও বাংলাদেশ সেগুলোতে যুক্ত হতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। তবে চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখে ঢাকাকে এই উদ্যোগগুলো সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা উচিত। তিনি বলেন, জিডিআই ও জিসিআই তেমন কোনো সংবেদনশীল বিষয় নয় এবং অনেক দেশই এরই মধ্যে এতে যুক্ত হয়েছে। তবে জিএসআই যেহেতু একটি নিরাপত্তা কাঠামো এবং এটি বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত প্রতিযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই এটি নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। চীনের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারত্ব বাড়াতে জিডিআই ও জিসিআই-তে যুক্ত হওয়া যেতে পারে বলে তিনি অভিমত দেন।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন বেইজিং সফরে ঢাকা কীভাবে চীনের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক সুযোগ কাজে লাগায় এবং একই সঙ্গে ভারত ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে, সেটাই দেখার বিষয়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, বেইজিং হয়তো বাংলাদেশের কাছে এই তিন উদ্যোগের বিষয়ে একটি স্পষ্ট অবস্থান চাইবে। কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখার পাশাপাশি সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিতে ঢাকাকে হয়তো এবার কোনো না কোনোভাবে চীনের এই উদ্যোগে নীতিগত সাড়া দিতে হতে পারে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ