• মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০২:৩৬ অপরাহ্ন
Headline
বডিশেমিংয়ের উত্তর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবেই ভারত থেকে ফিরেছি: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা দিনে ১০ খুন: জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক ও উদ্বেগ নৌকাযোগে নারীকে পুশইনের চেষ্টা, রোকনপুর সীমান্তে বিএসএফের অপচেষ্টা রুখল বিজিবি সীমান্তে ‘অস্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’ খতিয়ে দেখতে দিল্লির উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন ৫৪ জেলার পানিতে বিষাক্ত আর্সেনিক ও আয়রন, বাড়ছে ক্যানসারের ঝুঁকি আদ-দ্বীনের অন্য শাখা চলতে বাধা নেই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী দুবাইয়ে ধৃত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ৩৩ মামলা, প্রত্যর্পণে নথিপত্র অনুবাদ হচ্ছে আরবিতে রামিসা হত্যা মামলা: আসামিদের পক্ষে ‘স্টেট ডিফেন্স’ নিয়োগের নির্দেশ হাইকোর্টের গ্যালারিতে ট্রুডো ও কেটি পেরি, নতুন করে বিশ্বমিডিয়ায় সম্পর্কের গুঞ্জন

প্রিপেইড মিটার রিচার্জ নিয়ে ভোগান্তিতে ৫৫ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক

Reporter Name / ৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

দেশের বিদ্যুৎ খাতে আধুনিকায়ন ও গ্রাহকসেবা সহজ করার লক্ষ্যে প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা চালু করা হলেও বর্তমানে এটি লাখ লাখ সাধারণ মানুষের জন্য এক চরম ভোগান্তি ও যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিটারে টাকা রিচার্জ করতে গিয়ে নজিরবিহীন কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন গ্রাহকেরা। বিশেষ করে রিচার্জ করার পর পাওয়া টোকেন নম্বরের অস্বাভাবিক দীর্ঘ আকৃতি এবং বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়ার কারণে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দেশের বড় একটি অংশজুড়ে প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকেরা রিচার্জের জটিলতায় পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনভর বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। সমস্যার সমাধান পেতে তাদের প্রতিদিন ভিড় করতে হচ্ছে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসগুলোতে।

বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)-র অধীনে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। এর মধ্যে প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন প্রায় ৫৫ লাখ গ্রাহক। বিশাল এই গ্রাহকগোষ্ঠীই এখন রিচার্জের নতুন নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

২০০ থেকে ৩০০ ডিজিটের টোকেন বিড়ম্বনা

গ্রাহকদের সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গা তৈরি হয়েছে রিচার্জের সময় পাওয়া ডিজিটাল টোকেন নম্বর নিয়ে। আগে যেখানে সাধারণ রিচার্জের জন্য মাত্র ২০ ডিজিটের একটি কোড নম্বর আসত, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে ২০০ থেকে ৩০০ ডিজিটের লম্বা টোকেন নম্বর আসছে। এত বিশাল অংকের সংখ্যা মিটারের ছোট কিপ্যাডে একটি একটি করে প্রবেশ করানো অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ।

টোকেন নম্বর প্রবেশ করানোর সময় সামান্য একটি সংখ্যা ভুল হলেই পুরো প্রক্রিয়াটি বাতিল হয়ে যায় এবং বারবার ভুল চাপার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিটার লক বা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একবার মিটার লক হয়ে গেলে গ্রাহকের ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই লক খোলার জন্য গ্রাহকদের বাধ্য হয়ে স্থানীয় বিদ্যুৎ কার্যালয়ে ছুটতে হচ্ছে। সেখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও দ্রুত সমস্যার সমাধান মিলছে না। ফলে ডিজিটাল এই প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়ার বদলে সাধারণ মানুষ এখন একে এক বড় ধরনের বোঝা হিসেবে দেখছেন।

দেশজুড়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগ

সারাদেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের প্রিপেইড গ্রাহকদের সাথে কথা বলে এই গণভোগান্তির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের বাসিন্দা সুমন মিয়া আক্ষেপ করে জানান, সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা বলে এই ডিজিটাল মিটার চালু করা হলেও এখন এটি কেবলই অসুবিধা বাড়াচ্ছে। একদিকে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বিলের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে মিটারের অতিরিক্ত চার্জ ও দীর্ঘ ডিজিটের কোড টাইপ করার বিড়ম্বনা জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। একবার চাপতে ভুল হলে পুরো প্রক্রিয়া আবার শুরু থেকে করতে হয়। ভুল করতে করতে মিটার লক হয়ে গেলে পুরো দিন বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।

একই শহরের ব্যবসায়ী ফরহাদ হোসেন নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, মিটারের টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশের মাধ্যমে রিচার্জ করতে গিয়ে সার্ভার সমস্যার মুখে পড়েন। পরে একটি রিচার্জ এজেন্টের দোকানে গিয়েও একই জটিলতা দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে তিনি পিডিবির গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যান এবং সেখানে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে রিচার্জ সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।

সিলেট নগরীর মিরর ময়দান, আড়পাড়া ও উপশহর এলাকার একাধিক গ্রাহক জানান, রিচার্জের পর মোবাইলে আসা বিপুলসংখ্যক টোকেন নম্বর দেখে তারা প্রথমে হতবাক হয়ে যান। বারবার চেষ্টা করেও সঠিক নিয়মে নম্বর টাইপ করতে না পেরে তারা বিদ্যুৎ বিভাগের শরণাপন্ন হন। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের পরামর্শে ওই বিশাল সংখ্যাকে ২০টি করে ডিজিটে ভাগ করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মিটারে প্রবেশ করাতে হয়েছে।

রংপুরের আলু পট্টি এলাকার বাসিন্দা দোলন দাস জানান, আগে বিকাশে টাকা পাঠালে মিটার স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রিচার্জ হয়ে যেত এবং কোনো অতিরিক্ত কোড চাপতে হতো না। কিন্তু এখন নতুন নিয়মে দীর্ঘ টোকেন নম্বর দিতে হচ্ছে, যা সাধারণ এবং বয়স্ক মানুষের জন্য অত্যন্ত জটিল। কিশোরগঞ্জ শহরের ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিন জানান, তাঁর দোকানে রিচার্জ করতে আসা প্রায় সব গ্রাহকই এই দীর্ঘ টোকেন কোড নিয়ে প্রতিদিন তাঁর কাছে ক্ষোভ ও অভিযোগ জানাচ্ছেন। শেরপুর শহরের কলেজ শিক্ষক মলয় চাকী আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা শিক্ষিত মানুষ হয়েও এই ৩০০ ডিজিটের কোড মিটারে প্রবেশ করাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি, তাহলে সাধারণ গ্রামীণ মানুষ ও বয়স্ক-নিরক্ষর মানুষের অবস্থা কতটা খারাপ তা সহজেই অনুমেয়।” এছাড়া নরসিংদী, পিরোজপুর, মুন্সীগঞ্জ, রাজশাহী, রাঙামাটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজবাড়ী ও মাগুরার প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের কাছ থেকেও একই ধরনের রিচার্জ বিড়ম্বনার খবর পাওয়া গেছে।

অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়ার নতুন জঞ্জাল

গ্রাহকদের অভিযোগ কেবল দীর্ঘ টোকেন নম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; রিচার্জের টাকা থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের সমসেরাবাদ এলাকার বাসিন্দা সফিকুর রহমান জানান, তিনি তাঁর মিটারে ৫০০ টাকা রিচার্জ করার পর মিটারের স্ক্রিনে ব্যবহারযোগ্য ব্যালেন্স দেখতে পান মাত্র ৩৫১ টাকা ১৯ পয়সা। বাকি টাকা মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট বাবদ কেটে নেওয়া হয়েছে।

একইভাবে কিশোরগঞ্জের একটি হোটেলের ম্যানেজার জাফর উল্লাহ জানান, তিনি ব্যবসার প্রয়োজনে তিন হাজার টাকা রিচার্জ করার পর দেখতে পান যে ডিমান্ড চার্জ বাবদই তার এক ধাক্কায় প্রায় ৮০০ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে, যা দেখে তিনি সম্পূর্ণ বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। ঢাকার শেওড়াপাড়ার গ্রাহক রফিকুল ইসলাম জানান, গত তিন মাস ধরে রিচার্জ করার পর তাঁর মোবাইলে ব্যালেন্সের কোনো নিশ্চিতকরণ এসএমএস আসছে না। ফলে কত টাকা রিচার্জ হলো এবং কোন খাতে কত টাকা কেটে নেওয়া হলো, তা জানার কোনো উপায় তাঁর কাছে নেই।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে গ্রাহকদের পকেট কাটার এক নীরব উৎসব হিসেবে দেখছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম এই বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নিয়মনীতি না মেনে গ্রাহকদের অন্ধকারে রেখে এভাবে টাকা কেটে নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই আদালতে মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যা ও বিশেষজ্ঞদের দ্বিমত

গ্রাহকদের এই নজিরবিহীন ভোগান্তির মুখে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের দাবি, এটি কোনো স্থায়ী সমস্যা নয়, বরং একটি সাময়িক কারিগরি প্রক্রিয়া। কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যুতের ট্যারিফ বা মূল্যহার পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন এই মূল্যহার কার্যকর করার ফলে প্রতিটি স্ল্যাবের (ব্যবহারের স্তর) হালনাগাদ তথ্য মিটারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লোড করার জন্য এই দীর্ঘ কোডের সৃষ্টি হয়েছে। যেহেতু প্রতিটি স্ল্যাবের জন্য আলাদাভাবে ২০ ডিজিটের কোড পাঠানো সম্ভব নয়, তাই সব স্ল্যাবের ডেটা বা তথ্যকে একত্র করে ২০০ বা তার বেশি ডিজিটের একটি সমন্বিত টোকেন তৈরি করা হয়েছে।

পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিন বলেন, “এটি সম্পূর্ণ সাময়িক একটি বিষয়। নতুন ট্যারিফের তথ্য একবার মিটারে সফলভাবে হালনাগাদ (আপডেট) হয়ে গেলে পরবর্তী রিচার্জের সময় গ্রাহকেরা আবার আগের মতোই স্বাভাবিক ও ছোট টোকেন নম্বর পেয়ে যাবেন।” ডিপিডিসি-র আইসিটি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক রবিউল ইসলামও একই সুর মিলিয়ে বলেন, বিদ্যুতের দাম স্ল্যাবভিত্তিক পরিবর্তিত হওয়ার কারণে এই ডেটা মিটারে পাঠাতে হচ্ছে। সাময়িক এই ভোগান্তি দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে। গ্রাহকদের এসএমএস না পাওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, নেটওয়ার্কের ত্রুটির কারণে অনেক সময় এসএমএস পৌঁছাতে দেরি হয় বা মিসিং হয়। গ্রাহকেরা সরাসরি আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে আমরা তা সমাধান করে দিচ্ছি। তবে তিনি ভ্যাট বা অতিরিক্ত বিল কাটার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, সরকার নির্ধারিত হারের বাইরে কোনো বাড়তি টাকা রাখা হচ্ছে না। নেসককার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামও জানান, সফটওয়্যার উন্নয়নের কাজ শেষ হলেই এই দীর্ঘ টোকেন ব্যবহারের ঝামেলা থেকে গ্রাহকেরা মুক্তি পাবেন।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এই সাময়িক সংকটের দাবিকে মানতে নারাজ জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো নতুন নিয়ম বা ট্যারিফ কার্যকর করার আগে বিতরণ সংস্থাগুলোর উচিত ছিল তাদের নিজস্ব সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিকে পুরোপুরি প্রস্তুত করা। গ্রাহকদের আগাম কোনো সতর্কবার্তা বা প্রশিক্ষণ না দিয়ে হঠাৎ করে এভাবে ৩০০ ডিজিটের কোড ধরিয়ে দেওয়া অদক্ষতার শামিল। ডিজিটাল সেবার নামে ৫৫ লাখ গ্রাহককে এভাবে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে ঠেলে দেওয়ার দায় বিতরণ সংস্থাগুলো এড়াতে পারে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

সূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category