• রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৭ অপরাহ্ন
Headline
২০৩০ সালের মধ্যে ১০৬.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের নিখোঁজ শিশুর লাশ মিলল সীমান্তের ওপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন কতজন, তালিকায় যারা জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান জাতিসংঘে নতুন সরকারের বার্তা দেবেন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী কাল নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন সরকার স্টার্টআপ, উদ্যোক্তা তৈরি ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে : জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা: রাষ্ট্রদূত মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মন্ত্রিসভায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অধ্যাদেশের সংশোধনী অনুমোদন

বেলুচিস্তানের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম: সম্পদ, অধিকার ও এক স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন

Reporter Name / ৬ Time View
Update : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে এমন একটি অঞ্চলের অবস্থান রয়েছে, যার একদিকে বিশাল আরব সাগর আর অন্যদিকে ইরান ও আফগানিস্তানের রুক্ষ সীমান্ত। মাটির নিচে লুকিয়ে আছে তামা, সোনা, ক্রোমাইট, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার মতো অমূল্য সব খনিজ সম্পদের বিপুল ভান্ডার। আর এই সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সমুদ্রতীরে গড়ে উঠেছে এমন এক কৌশলগত বন্দর, যাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন নির্মাণ করছে তাদের স্বপ্নের অর্থনৈতিক করিডোর। আপাতদৃষ্টিতে এই বর্ণনা শুনে মনে হতে পারে এটি কোনো সমৃদ্ধ ও শান্ত জনপদের গল্প। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ভূখণ্ডের নাম বেলুচিস্তান, যা বর্তমানে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘকাল ধরে চরম অস্থিরতা, রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও অধিকার আদায়ের এক ভয়ংকর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এখানকার সাধারণ মানুষের দাবি—সম্পদ তাদের, ভূমি তাদের, তাই এই ভূখণ্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তাদেরই থাকতে হবে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এই দাবিকে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিয়ে বলছে, এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিছক সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং বেলুচিস্তান তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বেলুচিস্তানের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের শিকড় লুকিয়ে আছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাসে। ব্রিটিশরা যখন উপমহাদেশ ছাড়ে, তখন ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সেই সময় কালাত ছিল বর্তমান বেলুচিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র। পাকিস্তান সরকারের দাবি অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালের ২৭শে মার্চ কালাতের খান স্বেচ্ছায় পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু এখানেই শুরু হয় মূল বিতর্ক। বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের দৃঢ় দাবি হলো, পাকিস্তানের সঙ্গে কালাতের সেই অন্তর্ভুক্তি কখনোই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না, বরং তা ছিল প্রবল চাপের মুখে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত, যেখানে সাধারণ বেলুচদের কোনো পূর্ণ সম্মতি ছিল না। যদিও ইসলামাবাদ সব সময়ই এই যুক্তি খণ্ডন করে যোগদানকে বৈধ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দাবি করে আসছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বেলুচিস্তান সরকারের নিজস্ব ইতিহাস বিষয়ক ওয়েবসাইটও এই সত্য স্বীকার করে যে, প্রদেশ হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিয়ে তৎকালীন সমাজে গভীর রাজনৈতিক বিতর্ক ও ভিন্নমত ছিল। মূলত এই জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তির পরপরই ১৯৪৮ সাল থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বেলুচদের প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় মাত্রার সংঘাত ঘটে এবং একুশ শতকের শুরু থেকে এই বিদ্রোহ সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে বেলুচ লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ-সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী পাকিস্তান থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
বেলুচিস্তানের এই সংঘাতকে শুধু একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মূল কারণ নিহিত রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের চরম শোষণ ও রাজনৈতিক বঞ্চনার মধ্যে। বেলুচিস্তানের মাটির নিচে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামা ও সোনার ভান্ডার, যার মধ্যে ‘সাইকান্ত’ ও ‘রেকডিক’ খনির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপের গবেষণায়ও এই অঞ্চলের খনিজ সম্পদের বিপুল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বেলুচদের প্রধান অভিযোগ হলো, পাকিস্তান সরকার ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যুগের পর যুগ ধরে এই অমূল্য খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, কিন্তু স্থানীয় সাধারণ জনগণ এই বিপুল সম্পদের বিন্দুমাত্র সুফল পাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের একটি মূল্যায়নেও এই বঞ্চনার চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে পাকিস্তানের জাতীয় গড়ের তুলনায় বেলুচিস্তানের দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের মতো মৌলিক সুবিধাগুলো আজও সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও আন্তর্জাতিক মাত্রায় নিয়ে গেছে চীনের মেগা প্রকল্প ‘চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর’ বা সিপিইসি। প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশকে স্থলপথে পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে আরব সাগরের তীরবর্তী গদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা। ২৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরটি চীনের অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক কারণে চীনের কাছে গদর বন্দর এবং বেলুচিস্তান અત્યন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান ও চীন দাবি করছে যে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে গদরে বিমানবন্দর, হাসপাতাল, এক্সপ্রেসওয়ে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কিন্তু বেলুচ অধিকারকর্মীরা এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে বলছেন যে, এই মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় মানুষের কোনো অংশগ্রহণ নেই এবং ধীরে ধীরে সমুদ্র ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর থেকে স্থানীয়দের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
এই চরম বঞ্চনার পাশাপাশি বেলুচিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘকাল ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ তুলে আসছে। সন্দেহভাজন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও অধিকারকর্মীদের বিনা বিচারে আটক করে গুম করে ফেলা এখানে একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে দাবি করে যে, তারা সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে যারা অবকাঠামো ও চীনা নাগরিকদের ওপর হামলা চালায়। এই পুরো দৃশ্যপটে ভারতকেও জড়িয়েছে পাকিস্তান। তাদের অভিযোগ, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে। যদিও ভারত সব সময়ই এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এত রক্তপাত, গুম আর বঞ্চনার মধ্যেই বেলুচিস্তানের প্রতিরোধ আন্দোলনে নতুন এক অদম্য শক্তির উত্থান ঘটেছে, যার নাম মাহরাং বেলুচ। পেশায় একজন চিকিৎসক হয়েও তিনি আজ বেলুচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত ও সাহসী মুখ। ২০০৯ সালে তাঁর বাবা আবদুল গাফফার লঙ্গোভ নিখোঁজ হওয়ার পর তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়, যা মাহরাংয়ের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দেয়। ২০২৩ সালের শেষের দিকে তিনি নিখোঁজ ও নিহত বেলুচদের পরিবারগুলোকে নিয়ে এক বিশাল পদযাত্রার নেতৃত্ব দেন, যা পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। মাহরাংয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, তিনি এই আন্দোলনকে শুধু পুরুষ যোদ্ধাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সম্প্রতি এক সমাবেশে মাহরাং বেলুচকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ অনুসরণ করার আহ্বান জানাতে দেখা গেছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যেভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি আজ বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের কাছে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক উপমা ও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে।
বেলুচদের এই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কতটা তীব্র, তা গত ১১ই আগস্ট স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা দিবসের তিন দিন আগেই বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা এই দিনটিকে নিজেদের ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। দেশের ভেতরে ও বাইরে অবস্থানরত বেলুচরা এই দিনটিতে ব্যাপক সমাবেশ ও সামাজিক মাধ্যমে ‘ফ্রি বেলুচিস্তান’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। তবে বেলুচিস্তানের এই স্বাধীনতার দাবি শুধু পাকিস্তানের জন্যই নয়, চীনের জন্যও এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ। কারণ সিপিইসি প্রকল্পে চীনের বিপুল বিনিয়োগের কারণে এই অঞ্চলের অখণ্ডতা রক্ষা করা বেইজিংয়ের জন্যও এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও এই দুর্বলতাটি ধরতে পেরেছে এবং তারা সুকৌশলে চীনা নাগরিক ও প্রকল্পগুলোকে তাদের হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
সব মিলিয়ে বেলুচিস্তান আজ এক বিশাল ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। এখানকার সব মানুষ হয়তো পুরোপুরি স্বাধীনতা চায় না, অনেকেই পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরেই পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু বঞ্চনা ও নিপীড়ন যদি চলতেই থাকে, তবে এই ক্ষোভ যে একদিন স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দিকে ধাবিত হবে না, তা কেউ বলতে পারে না। বেলুচিস্তান শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের ভেতরেই নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ খুঁজে নেবে, নাকি একটি নতুন স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করবে—এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর শুধু পাকিস্তানের অস্তিত্ব নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category