• শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ০৭:৫১ অপরাহ্ন
Headline
আকাশচুম্বী টিকিটের দাম: বিশ্বকাপের ফাঁকা গ্যালারি নিয়ে উদ্বেগ শ্রমিকের হাহাকারে মালিকদের বিপুল ভাগ্য ট্রাম্পের যুদ্ধ থামানোর সিদ্ধান্তে হতবাক নেতানিয়াহু, জানতেন না কিছুই! ট্রাম্পের নতুন মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা ও সমঝোতার নেপথ্য কথা ইরানের সঙ্গে কাতারের গোপন আঁতাত! ফাঁস করল ওয়াশিংটন পোস্ট ছুটির দিনের বিকেলে রাজধানীতে স্বস্তির বৃষ্টি, ভোগান্তিতে পথচারী সম্মিলিত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের আশ্বস্ত করলেন গভর্নর বিজিবির কঠোর অবস্থান: শূন্যরেখায় আটকে নারী-শিশুসহ ১২ জন বেতন বাড়লে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি কমবে: অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ঋণনির্ভর উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটের’ আখ্যা দিল জামায়াত

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের মহাবিপর্যয়

Reporter Name / ১৬ Time View
Update : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলোতে আর্থিক খাতের সুশাসনের অভাব এবং কাঠামোগত দুর্বলতার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, যা দেশের সচেতন মহল এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আকাশচুম্বী হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মাত্র ৯০ দিনের সংক্ষিপ্ত ব্যবধানে খেলাপি ঋণ এক ধাক্কায় আরও ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেড়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে আর্থিক খাতের অন্যতম বড় একটি নেতিবাচক রেকর্ড। বিগত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের সমাপ্তিতে যেখানে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, সেখানে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শেষ নাগাদ তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ কেবল একটি সংখ্যা মাত্র নয়, বরং এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির রক্তক্ষরণ এবং সাধারণ আমানতকারীদের জমানো টাকার চরম নিরাপত্তাহীনতার এক বাস্তব ও নির্মম বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতের এই সংকট কতটা গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে দেশের সচল থাকা ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণকৃত মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, এই বিশাল অঙ্কের বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকাই বর্তমানে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের খাতায় নাম লিখিয়েছে। গাণিতিক হিসাবে এটি দেশের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো বাজার থেকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে আমানত সংগ্রহ করে যে ঋণ বিতরণ করেছে, তার প্রতি তিন টাকার মধ্যে এক টাকারও বেশি এখন আদায় অযোগ্য বা আটকে থাকা ঋণে পরিণত হয়েছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই খেলাপি ঋণের সামগ্রিক হার ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। কারণ, বিগত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে এই খেলাপি ঋণের গড় হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। মাত্র এক প্রান্তিকের ব্যবধানে হারের এই উল্লম্ফন প্রমাণ করে যে ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো কতটা ভেঙে পড়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে বেশি শোচনীয় ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম এবং ভুয়া নথির মাধ্যমে ঋণ বিতরণের খেসারত দিতে হচ্ছে এই সরকারি ব্যাংকগুলোকে। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ Caledonian বা ৪৯ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা। এই অঙ্কটি সরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা প্রায় অর্ধেক ঋণের সমান। অর্থাৎ, সরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের অর্ধেকই এখন খেলাপির অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে, দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ঋণ কেলেঙ্কারি এবং উদ্যোক্তা পরিচালকদের অনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও খেলাপি ঋণের পাহাড় জমেছে। তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা তাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এই নাজুক পরিস্থিতি পুরো ব্যবসায়ী সমাজ ও শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির বিপরীতে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে দেশে მოქმედ বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কঠোর করপোরেট সুশাসন, নিবিড় তদারকি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার কারণে বিদেশী ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। বিদেশী ব্যাংকগুলোর বর্তমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ২৬২ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের মাত্র ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। তবে দেশের বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর চিত্র আবার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মতোই অন্ধকারাচ্ছন্ন। কৃষি, শিল্প ও বিশেষ খাতে উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। এই অঙ্কটি তাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সামগ্রিক পরিসংখ্যান স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, খেলাপি ঋণের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের পুরো ব্যাংকিং এবং আর্থিক খাতের মেরুদণ্ডকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যার ফলে নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না এবং দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই চরম আর্থিক সংকট ও তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেবল কাগজের নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বড় বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category