সরকার মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের দেশ-বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় প্রটোকল বা রাষ্ট্রাচার নিয়ে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে। গত ১৬ এপ্রিল জারি করা এই বিস্তারিত নির্দেশনাগুলো ২০ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। মূলত ভিআইপিদের সফরের সময় স্থানীয় প্রশাসনের স্বাভাবিক কাজে যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে এবং প্রটোকলের নামে অতিরিক্ত সময় বা জনবলের অপচয় না হয়, সেই লক্ষ্যেই এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নতুন এই নির্দেশনায় বিমানবন্দর ও স্থানীয় পর্যায়ের অভ্যর্থনায় কর্মকর্তাদের উপস্থিতির বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে মন্ত্রীদের বিদেশ যাত্রার সময় কিংবা দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। তবে দেশের অভ্যন্তরে সফরের সময় ঢাকা ত্যাগ বা প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে কেবল মন্ত্রীর একান্ত সচিব উপস্থিত থাকলেই চলবে। অন্যদিকে, জেলা সদরে সফরে গেলে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) তাঁদের অভ্যর্থনা ও বিদায় জানাবেন। তবে এই নির্দেশনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, মন্ত্রীদের প্রটোকল দেওয়ার জন্য ডিসি বা এসপিকে তাঁদের নিজেদের পূর্বনির্ধারিত সরকারি সফর বাতিল বা পরিবর্তন করতে হবে না। সেক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এই দায়িত্ব পালন করবেন। তবে মন্ত্রী যদি বিশেষভাবে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, কেবল তখনই তাঁরা সফর বাতিল করবেন।
উপজেলা পর্যায়ের সফরে প্রটোকলের কড়াকড়ি আরও শিথিল করা হয়েছে। উপজেলা সদর বা অন্য কোনো স্থানে মন্ত্রীদের সফরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী পুলিশ সুপার এবং স্থানীয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অভ্যর্থনা জানাবেন। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে সেখানে ডিসি বা এসপির ছুটে যাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একইভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার বা যশোরের মতো শহরগুলোর বিমানবন্দর বা রেলস্টেশন দিয়ে মন্ত্রীরা কেবল যাতায়াত বা ট্রানজিট ব্যবহার করলে সেখানেও স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের (ডিসি বা পুলিশ কমিশনার) উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই বলে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রেন যাত্রার ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের সফরসূচি পাওয়ার পরপরই রেলওয়ে পুলিশ সুপারকে সংশ্লিষ্ট রুটের সব থানা ও ফাঁড়িকে সতর্ক করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় জংশনগুলোতে পুলিশের পরিদর্শক বা উপপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকতে হবে।
নির্দেশনায় সরকারি ও ব্যক্তিগত সফরের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে। এখন থেকে সফরসূচি প্রণয়নের সময়ই সেটি সরকারি নাকি ব্যক্তিগত, তা দপ্তর থেকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। সরকারি সফরের ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক সব খরচ ও ব্যবস্থাপনা সরকার বহন করলেও, ব্যক্তিগত সফরের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সরকারি যানবাহন ও বাসস্থানের জন্য প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট মূল্য পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া মন্ত্রীরা সার্কিট হাউস বা ডাকবাংলোর বদলে নিজ বাড়ি বা অন্য কোথাও অবস্থান করলেও তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি স্থানীয় পুলিশ সুপারই নিশ্চিত করবেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিআইপি প্রটোকল নিয়ে প্রায়শই সাধারণ মানুষের যাতায়াতে ভোগান্তি ও স্থানীয় প্রশাসনের স্থবিরতার অভিযোগ ওঠে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে মন্ত্রীরা ব্যক্তিগত বা সাধারণ সরকারি সফরে অতিরিক্ত প্রটোকল এড়িয়ে চলেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা সাধারণ নাগরিকদের মতোই ট্রেন, সাবওয়ে বা সাইকেল ব্যবহার করে থাকেন, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় করে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে ব্যক্তিগত সফরকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে দেখা হয় এবং সেখানে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ব্যবহারের সুযোগ থাকে না বললেই চলে। বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নতুন এই নির্দেশনার কঠোর বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এর ফলে স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রটোকলের পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে জনসেবা ও দাপ্তরিক কাজে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাবেন।