মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত কেবল যুদ্ধময়দানেই সীমাবদ্ধ নেই, এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে ডিজিটাল জগতেও। তবে এই যুদ্ধের খবরাখবর বা ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করাটা এখন মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য এক ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে। যুদ্ধকালীন আকাশসীমার দৃশ্য, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা সামরিক গতিবিধির কোনো ছবি বা ভিডিও নিজেদের ফেসবুক, টিকটক বা এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করলেই নেমে আসছে কঠোর আইনি খড়গ। সাধারণ কৌতূহল বা আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন কাজ করায় প্রতিদিনই অনেক প্রবাসী হঠাৎ করে গ্রেপ্তার হচ্ছেন, আবার অনেককে কোনো নোটিশ ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে।
এই চরম আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা। সাধারণত আবেগপ্রবণ হয়ে কিংবা যুদ্ধের খবরাখবর দেশে থাকা স্বজন ও বন্ধুদের জানাতে গিয়ে অনেকেই নিজেদের অজান্তে স্থানীয় সাইবার আইনের সীমারেখা অতিক্রম করে ফেলছেন। আকাশে উড়ে যাওয়া ড্রোন, ইন্টারসেপ্টর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের দৃশ্য কিংবা রাস্তায় সামরিক যানের আনাগোনা মোবাইল ফোনে ধারণ করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারা। আর এই একটি মাত্র ভুলের কারণে মুহূর্তের মধ্যেই তাদের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিচ্ছে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যার ফলে দেশে থাকা তাদের পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তায় নিপতিত হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর সাইবার নিরাপত্তা আইন অত্যন্ত কঠোর এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের নীতি ‘জিরো টলারেন্স’। এসব দেশের আইন অনুযায়ী, সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া যেকোনো ধরনের সামরিক স্থাপনা, যুদ্ধাস্ত্র বা সংঘাতের ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা রাষ্ট্রদ্রোহ এবং গুরুতর সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়া অনলাইনে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামরিক পক্ষের প্রতি সমর্থন জানানো কিংবা গুজব ছড়ানোকেও সেখানে কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে। অত্যাধুনিক সাইবার নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ মুহূর্তেই এসব পোস্ট শনাক্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে জেল, বিশাল অঙ্কের জরিমানা এবং সবশেষে দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) মতো কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর কড়া নজরদারি রাখছে। শুধু ভিডিও পোস্ট করাই নয়, বরং সংবেদনশীল কোনো পোস্টে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করার কারণেও অনেক বাংলাদেশিকে চাকরিচ্যুত করে কোম্পানির তরফ থেকে টার্মিনেশন লেটার ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়া এবং সরকারি রোষানলে পড়ার ভয়ে কোম্পানিগুলো কর্মীদের ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস এবং প্রবাসী কল্যাণ ফোরামগুলো থেকে প্রবাসীদের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা জারি করে তাদের যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক, সামরিক বা উসকানিমূলক পোস্ট থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দিন শেষে, মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রবাসীদের জন্য এক অদৃশ্য ডিজিটাল মাইনফিল্ড তৈরি করেছে। যে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাঠানো অর্থে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে, তাদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি অসতর্ক ক্লিক বা শেয়ার এখন পুরো ভবিষ্যৎ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো বাংলাদেশির জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন এবং স্থানীয় আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থাকাটা কেবল সচেতনতাই নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব ও জীবিকা টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হয়ে উঠেছে।