মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের উত্তাপ এবার সরাসরি এসে লেগেছে বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশের কৃষকরা একই সঙ্গে দুটি বড় সংকটের মুখে পড়েছেন—চলতি বোরো মৌসুমে সেচকাজের জন্য ডিজেলের তীব্র আকাল এবং আসন্ন মৌসুমগুলোর জন্য সারের ঘাটতির শঙ্কা। সরকার পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলে আশ্বস্ত করলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে।
সেচে ডিজেলের হাহাকার, হুমকির মুখে বোরো আবাদ
বর্তমানে দেশে বোরো ধানের ভরা মৌসুম চলছে, যা পুরোপুরি সেচনির্ভর। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত জমিতে নিয়মিত সেচ দিতে হয়। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে, যার সিংহভাগই ডিজেলচালিত। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও হাওর এলাকায় ডিজেল ছাড়া সেচ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কৃষকরা চরম হতাশা নিয়ে জানাচ্ছেন, তারা চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছেন না। ঠিক এই সময়ে ধানের জমিতে সেচ দিতে না পারলে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকার ও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দেশে সেচের জ্বালানির কোনো সংকট নেই এবং তেলের অভাবে কোথাও সেচকাজ ব্যাহত হয়নি। জ্বালানি নির্ভরতায় এককভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ভরসা না করে ইতোমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানানো হয়। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, সেচে এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো উৎপাদন কমে গিয়ে চালের বাজারে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।
গ্যাস সংকটে বন্ধ সার কারখানা, আমদানিতেও কালো মেঘ
ডিজেলের পাশাপাশি কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে সারের ভবিষ্যৎ সরবরাহ। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ হলেও বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদার সিংহভাগই বিদেশ থেকে মেটাতে হয়। এর মধ্যে কেবল ইউরিয়া সারেরই চাহিদা প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন, যার মাত্র ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়। সারের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস হলো মধ্যপ্রাচ্যের কাতার ও সৌদি আরব। কিন্তু যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় সেই সরবরাহ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
শুধু আমদানি নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ সার উৎপাদনও বড় ধাক্কা খেয়েছে। সার কারখানাগুলো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে গ্যাস সাশ্রয় করতে গত মার্চের শুরু থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটি এবং বেসরকারি কাফকো সার কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে সরকার।
সরকারের দাবি ও মজুত পরিস্থিতি
এতসব উদ্বেগের মধ্যেও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ অভয় দিয়ে জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে সার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দেশে যে পরিমাণ সার মজুত রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত এক বছর অনায়াসে চালিয়ে নেওয়া যাবে। মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরিয়া ৪ লাখ ৯৩ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৮২ হাজার টন, ডিএপি ৫ লাখ ৯ হাজার টন এবং এমওপি ৩ লাখ ৪২ হাজার টন মজুত রয়েছে। কৃষিমন্ত্রী জানান, বোরো মৌসুম প্রায় শেষের দিকে এবং আসন্ন আমন মৌসুমে সারের চাহিদা কম থাকে। মূলত আগামী বছরের বোরো মৌসুমকে লক্ষ্য করে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন, মিশর বা রাশিয়ার মতো বিকল্প দেশগুলো থেকে সার আমদানির চেষ্টা চলছে। বন্ধ কারখানাগুলোও শিগগিরই চালু করার বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
কৃত্রিম সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা
সরকারি পর্যায়ে মজুতের কথা বলা হলেও, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিলাররা যুদ্ধের অজুহাতে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দাম আদায় করছেন বলে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, “বাস্তবে সংকট তৈরি হওয়ার আগেই আমরা একটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফেলি, এটাই আমাদের মূল সমস্যা।”
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সিআরইউ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ৪৯০ ডলার থেকে ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে। কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এই অবস্থা চললে সার ছাড়াও বিশ্বব্যাপী গমের দাম ৪.২ শতাংশ এবং ফল-সবজির দাম ৫.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিশ্বের মোট সার রপ্তানির এক-পঞ্চমাংশের জোগানদাতা হিসেবে রাশিয়া এখন এই বাজারে নিজেদের আধিপত্য আরও বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু মজুতের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত সার আমদানির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি, কৃষিখাতকে বাঁচাতে অবিলম্বে কৃষির জন্য আলাদা ডিজেল বরাদ্দ, ড্রাম ব্যবহারকারী কৃষকদের জন্য সহজে তেল বিক্রির স্পষ্ট নির্দেশনা, মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি, ডিজেলে বিশেষ ভর্তুকি এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পের ব্যবহার সম্প্রসারণের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।