২০১৮ সালের ১২ মে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেটের পিঠে চড়ে মহাকাশে পাড়ি জমায় বাংলাদেশের প্রথম নিজস্ব যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ (যাকে বর্তমানে ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’ বা বিএস-১ বলা হচ্ছে)। উৎক্ষেপণের পর তৎকালীন সরকার এটিকে দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে ঘোষণা করেছিল। দেশবাসীকে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শুধু বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রাই সাশ্রয় হবে না, বরং বিদেশের কাছে ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়ে দেশ আর্থিকভাবেও বিপুল লাভবান হবে।
কিন্তু মহাকাশে স্যাটেলাইটটির উৎক্ষেপণের আট বছর পর, অর্থাৎ এর ১৫ বছর আয়ুষ্কালের অর্ধেকের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর, প্রাপ্তির খাতা মেলাতে গেলে হতাশার চিত্রই ফুটে ওঠে। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প আজও আর্থিকভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং নকশাগত ত্রুটি, ভুল অরবিটাল স্লট নির্বাচন, আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে ব্যর্থতা এবং প্রকল্প অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাবের মতো গুরুতর বিষয়গুলো এখন সামনে আসছে।
আপনার দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও মহাকাশ বিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং দেশীয় সংবাদমাধ্যমের উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে এই স্যাটেলাইট প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস কোম্পানির নির্মিত এই স্যাটেলাইট প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। এর একটি বড় অংশ হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি) থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়। ২০১২ সালের সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, উৎক্ষেপণের সাত থেকে আট বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের পুরো অর্থ উঠে আসবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে এক অদ্ভুত আর্থিক চিত্র দেখা যায়:
২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ কোটি টাকা লোকসান দিয়ে যাত্রা শুরু করে কোম্পানিটি।
পরবর্তী কয়েক বছর (২০১৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত) কোম্পানিটি লাভ দেখায়।
কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবারও ৭৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২০ কোটি ৪৪ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়।
সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মুনাফার বড় অংশই এসেছে ব্যাংকে রাখা এফডিআর (FDR) এবং ব্যাংক আমানতের সুদ থেকে, স্যাটেলাইটের মূল সেবা বিক্রি থেকে নয়।
অবচয়ের হিসাব না করার অভিযোগ: খাত-সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএসসিএল তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে স্যাটেলাইটের অবচয় (Depreciation) হিসাব করেনি। ২,৯৬৮ কোটি টাকার সম্পদের আয়ুষ্কাল ১৫ বছর হলে, প্রতি বছর এর অবচয় দাঁড়ায় প্রায় ১৯৮ কোটি টাকা। এই অবচয়কে ব্যয়ের খাত হিসেবে ধরলে প্রতি বছরই কোম্পানিটি বিপুল অঙ্কের লোকসানে থাকার কথা।
মহাকাশে একটি স্যাটেলাইটের অবস্থান বা অরবিটাল স্লট তার সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ স্থাপন করা হয়েছে ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। কিন্তু আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য ৮৮ থেকে ৯১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ সবচেয়ে আদর্শ ছিল।
কেন ১১৯.১ ডিগ্রি? বাংলাদেশ শুরুতে ১০২ ডিগ্রি পূর্ব স্লটটি চেয়েছিল, কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোর আপত্তিতে তা পায়নি। পরবর্তীতে রাশিয়ার সংস্থা ‘ইন্টারস্পুটনিক’-এর কাছ থেকে ২৮ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ১১৯.১ ডিগ্রি স্লটটি কেনা হয়।
ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত সমস্যা: ১১৯.১ ডিগ্রিতে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ থেকে স্যাটেলাইটটির ‘এলিভেশন অ্যাঙ্গেল’ (Elevation Angle) বেশ হেলে থাকে। এর ফলে বর্ষাকালে বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতে সিগন্যাল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, যাকে কারিগরি ভাষায় ‘রেইন ফেড’ (Rain Fade) বলা হয়। এ কারণেই দেশে ডিরেক্ট-টু-হোম (DTH) এবং ভিস্যাট (VSAT) সেবার নিরবচ্ছিন্ন গুণগত মান নিয়ে প্রায়শই গ্রাহকদের অভিযোগ শুনতে হয়।
স্যাটেলাইটের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হলো আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতা টানতে না পারা। এই স্যাটেলাইটে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে (২৬টি কেইউ-ব্যান্ড এবং ১৪টি সি-ব্যান্ড)। এর মধ্যে কেইউ-ব্যান্ড (Ku-band) ট্রান্সপন্ডারগুলোর নকশায় বড় ধরনের গলদ রয়ে গেছে।
এগুলো চারটি আলাদা ব্লকে বিভক্ত। শর্ত হলো, একটি ব্লকের একটি ট্রান্সপন্ডার কোনো দেশে বিক্রি বা ভাড়া দেওয়া হলে, একই ব্লকের বাকি ট্রান্সপন্ডারগুলোও সেই দেশেই বিক্রি করতে হবে। যদি ওই দেশে বাড়তি চাহিদা না থাকে, তবে বাকি অংশ অব্যবহৃতই পড়ে থাকে।
পাশাপাশি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের আগেই সম্ভাব্য দেশগুলোর (যেমন: ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, নেপাল, ভুটান) সাথে ফ্রিকোয়েন্সি সমন্বয় এবং ‘ল্যান্ডিং রাইটস’ (Landing Rights) নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ছিল। পূর্বপ্রস্তুতির অভাবে বাংলাদেশ তা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল ও সম্ভাবনাময় বাজার বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে যায়। বর্তমানে স্যাটেলাইটটির সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩০ শতাংশ) অব্যবহৃত অবস্থায় মহাকাশে পড়ে আছে।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত তথ্যপ্রযুক্তি খাতের টাস্কফোর্সের শ্বেতপত্রে স্যাটেলাইট প্রকল্প নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। শ্বেতপত্র অনুযায়ী, এই বিশাল মেগা প্রকল্প অনুমোদনের সময় যথাযথ বাজার বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন বা বাস্তবসম্মত আয়-ব্যয়ের হিসাব করা হয়নি। শুধুমাত্র রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং চমক সৃষ্টির জন্যই প্রকল্পটি তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়ন করা হয়। একে ‘রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের’ একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) বর্তমানে এই প্রকল্পে অর্থ লোপাটের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। দুদকের প্রাথমিক ধারণা, বাংলাদেশের জন্য উপযোগী ও সাশ্রয়ী অরবিটাল স্লট না কিনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অনেক বেশি দামে রাশান স্লটটি কেনা হয়েছিল, যার ফলে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
বিদেশের বাজারে ব্যর্থ হলেও দেশের ভেতরে বিএসসিএল কিছুটা বাজার তৈরি করতে পেরেছে। বর্তমানে দেশের ৬০টিরও বেশি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে সম্প্রচার চালাচ্ছে। এর বাইরে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, সিভিল এভিয়েশন, বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও তাদের সুরক্ষিত যোগাযোগের জন্য এর ভিস্যাট সেবা নিচ্ছে। দেশে বর্তমানে একমাত্র ডিটিএইচ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘আকাশ ডিটিএইচ’ এই স্যাটেলাইটের অন্যতম বড় গ্রাহক। তবে শুরুতে টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং এবং দুর্গম হাওর ও পাহাড়ি এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা আজও বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়িত হয়নি।
বিএসসিএলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান বাস্তবতার কথা স্বীকার করে বলেন, “মার্কেট যাচাই না করেই বেশি খরচে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এখন আমাদের চেষ্টা হচ্ছে যতটুকু সম্ভব খরচ তুলে আনা।”
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির এই প্রকল্পের সারাংশ টানতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন যে, নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকা জাতির জন্য মর্যাদার বিষয় হলেও প্রযুক্তিগত অর্জনের সাথে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও মেলাতে হয়। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ প্রমাণ করেছে যে, সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ছাড়া শুধু আবেগের বশে বড় প্রকল্প নিলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই স্যাটেলাইট থেকে দেশের যে দক্ষ প্রযুক্তিগত জনবল তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেটিও হয়নি। সামনে ‘স্যাটেলাইট-২’ উৎক্ষেপণের যে আলোচনা চলছে, সেখানে অতীতের এই চরম ব্যর্থতাগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্রসমূহ (References):
১. সমকাল, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার
২. টেলিকম ও স্যাটেলাইট বিষয়ক জার্নাল (অরবিটাল স্লট ১১৯.১°E এবং রেইন ফেড সম্পর্কিত কারিগরি ডেটা)।
৩. বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL)-এর ওয়েবসাইটের প্রকাশনা (ট্রান্সপন্ডার ক্যাপাসিটি, কেইউ ও সি-ব্যান্ড স্পেসিফিকেশন)।