• শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৫ অপরাহ্ন
Headline
দুই মাসেই তলানিতে বিএনপির জনপ্রিয়তা, সরকারের দলীয়করণ নিয়ে তোপ নাহিদের জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর সরকার, বিয়ামের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা গণভোটের ৭০ শতাংশ রায় উপেক্ষিত, নতুন ফ্যাসিবাদ নিয়ে বিএনপিকে জামায়াতের তোপ ১ মে পল্টনে শ্রমিক দলের সমাবেশ, নির্বাচন নিয়ে জামায়াতকে ফখরুলের তোপ বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিত, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নতুন কড়াকড়ি রাজধানীর ৮০ পাম্পে ১২ লাখ বাইকের জটলা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে? “ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরানে ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধ, যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের জোর প্রস্তুতি জামায়াতের ‘লাফিং গ্যাস’: যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এটি মারাত্মক আসক্তির কারণ হয়ে উঠেছে

মার্কিন চুক্তির গোপন বেড়াজালে বাংলাদেশ

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক স্বার্থের ভারসাম্য। সাধারণ ভাষায়, চুক্তি মানেই হলো—‘আমি বাঁচব, আপনিও বাঁচবেন’। কিন্তু দরকষাকষির হিসাব যখন এমন এক অসম জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায় যে, নিজের দেশের অস্তিত্ব, বাজার ও স্বাধীনতা বিক্রি করে অন্যের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়, তখন আর তাকে নিছক ‘বাণিজ্য চুক্তি’ বলা যায় না; সেটি হয়ে ওঠে নব্য-উপনিবেশবাদের একটি আইনি দলিল। সম্প্রতিকালে বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির আকাশে এমনই এক ঘনকালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে একটি বিতর্কিত মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে।

যেখানে দেশের বাজার, আমদানি-রপ্তানির সিদ্ধান্ত এবং কৌশলগত স্বাধীনতা জড়িত, সেখানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের মেয়াদের ঠিক শেষ মুহূর্তে এমন একটি সুদূরপ্রসারী চুক্তি কীভাবে করে গেল, তা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ভূমিকা নিয়ে। সম্পূর্ণ দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার এই চুক্তিতে কি বিএনপির কোনো প্রচ্ছন্ন সম্মতি বা ‘গোপন সায়’ ছিল? ক্ষমতার পালাবদলের এই জটিল সমীকরণে চুক্তির অনুমতির বিনিময়েই কি তারা আজ ক্ষমতায় আসীন? সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবলি এবং দলটির রহস্যময় নীরবতা সেই সন্দেহকেই আরও ঘনীভূত করছে।


চুক্তির পটভূমি ও অস্বচ্ছতা: অন্ধকারের এক দলিল

একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচনকালীন সরকারের মূল এবং প্রধান দায়িত্ব হলো দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নীতি বা কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করার কোনো আইনি বা নৈতিক এখতিয়ার তাদের নেই। কিন্তু গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, সম্পূর্ণ জনচক্ষুর আড়ালে এবং তাড়াহুড়ো করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

চুক্তিটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (Agreement on Reciprocal Trade) বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি। নির্বাচনের ডামাডোলে দেশের মানুষ যখন রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত, তখন এত বড় একটি ঘটনা নীরবে ঘটে যায়। পরবর্তীতে যখন এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়, তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তড়িঘড়ি করে আপত্তি জানান এবং এমন কোনো চুক্তির অস্তিত্ব নেই বলে দাবি করেন। কিন্তু তাদের এই দাবি ধোপে টেকেনি। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (USTR) তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে এই চুক্তির ৩২ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ দলিল প্রকাশ করে দেয়। বাতাসে ভেসে বেড়ানো সব প্রশ্নের উত্তর যেন এই দলিলেই লুকিয়ে ছিল, যা ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছিল।


বিএনপির রহস্যময় নীরবতা: আপস নাকি কৌশল?

দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক জোটগুলো যখন এই অসম চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তখন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি পালন করছে এক অদ্ভুত নীরবতা। এই নীরবতা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নীরবতা নয়; এর মধ্যে জড়িয়ে আছে অস্বস্তি, সন্দেহ এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরাশক্তির সমর্থন ছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ক্ষমতায় আসা বা টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। বিএনপি কি নির্বাচনকে অবাধ ও প্রভাবমুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এমন কোনো ‘ট্রেড-অফ’ বা সমঝোতায় গিয়েছিল? দেশের তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার যেন কোনো এক অদৃশ্য দেয়ালে আটকে যাচ্ছে। কোথা থেকে জ্বালানি কেনা হবে, কী দামে কেনা হবে—এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের স্বাধীন সিদ্ধান্ত সরকার নিতে পারছে না। মনে হচ্ছে, কোনো এক ‘অদৃশ্য অভিভাবক’ পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে। বিএনপির এই নীরবতা প্রমাণ করে যে, এই চুক্তির বীজ বপনের সময় তারা হয়তো সরাসরি যুক্ত ছিল না, কিন্তু এর পরিণতির সাথে তারা রাজনৈতিকভাবে আপস করতে বাধ্য হয়েছে।


অসম শর্তের বেড়াজাল: বাণিজ্যের আড়ালে দাসত্ব

চুক্তির নাম ‘পারস্পরিক বাণিজ্য’ হলেও দলিলে থাকা শর্তগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করা হয়েছে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে এবং সেখান থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। এই ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কথা বলেই এই চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভারসাম্য আনার নামে দেশের নীতি ও স্বাধীনতাকেই বদলে ফেলা হচ্ছে চরম অসম শর্তের মাধ্যমে:

  • বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ১৪টি ‘বোয়িং’ ব্র্যান্ডের উড়োজাহাজ কিনতে হবে। এটি সম্পূর্ণ মুক্তবাজার অর্থনীতির পরিপন্থি। বাংলাদেশ বিমান বা বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো তাদের বাজেট ও কারিগরি সুবিধা অনুযায়ী এয়ারবাস বা অন্য যেকোনো কোম্পানির উড়োজাহাজ কেনার অধিকার রাখে। নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির পণ্য চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সুষ্ঠু বাণিজ্য হতে পারে না।

  • জ্বালানি খাতের পরাধীনতা: আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি কেনার শর্ত দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো দেশ থেকে প্রযুক্তি, জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না বলেও প্রচ্ছন্ন শর্ত রয়েছে। এর ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ভবিষ্যতে রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো দেশের সাথে বড় প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। এটি কেবল অর্থনীতি নয়, বরং দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।

  • কৃষিপণ্য ও বাজারের নিয়ন্ত্রণ: বছরে ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির শর্ত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে সমস্ত ‘অশুল্ক বাধা’ (Non-tariff barriers) এবং কোটা ব্যবস্থা তুলে নিতে বলা হয়েছে। এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে মার্কিন পণ্য এ দেশে কোনো প্রতিযোগিতার মুখেই না পড়ে। এর অর্থ হলো, দেশীয় কৃষকদের পথে বসিয়ে নিজেদের বাজারকে বিদেশি পণ্যের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত করা।


শ্রম আইন, পোশাক খাত এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এমনিতেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সুতা ও তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হবে না। আপাতদৃষ্টিতে এটি ভালো মনে হলেও, বাস্তবে দেখা গেছে শুল্ক কমালেও রপ্তানি বাড়েনি, বরং নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হলো, দুই বছরের মধ্যে দেশের সকল ইপিজেডকে (EPZ) সাধারণ শ্রম আইনের আওতায় আনার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বৈষম্যের শাস্তি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু রাতারাতি মার্কিন মানদণ্ড চাপিয়ে দেওয়া হলে দেশের অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তারা যে সুবিধা পান, মার্কিন কোম্পানিগুলোকেও অবিকল সেই একই সুবিধা দিতে হবে, যা দেশীয় শিল্পের বিকাশের জন্য এক বিশাল বাধা।


 ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও সার্বভৌমত্বের সংকট

এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিশাল ঝুঁকির মুখে পড়েছে। চুক্তির ভাষা নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়। এই চুক্তির ফলে বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তি বা জোটগুলোও একই ধরনের একচেটিয়া সুবিধা চাইতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই সেই ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। ফলে বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে আন্তর্জাতিক দড়াটানাটানির এক অসহায় ক্ষেত্রে পরিণত হবে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়মগুলো এখানে ইচ্ছামতো বাঁকানো হয়েছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ, সেখানে আন্তর্জাতিক নিয়ম মানা হয়েছে; আর যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ, সেখানে তা চরমভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি বাণিজ্যের আড়ালে মূলত প্রতিরক্ষা কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের একটি হাতিয়ার। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল শক্তি তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। সেই ক্ষমতা যদি ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে যায়, তাহলে উন্নয়ন আর নিজের থাকে না।


উত্তরণের উপায়: সরকারের করণীয় কী?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কীভাবে একটি দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা অন্তর্বর্তী সরকার দেশের স্বার্থ এভাবে বিসর্জন দিতে পারে? কীভাবে একটি পুরো বাজার অন্যের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নগুলো আজ কেবল রাজনৈতিক মহলের নয়, বরং আপামর জনসাধারণের।

তবে আশার কথা হলো, এখনো এই আত্মঘাতী ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ৬০ দিনের নোটিশে এটি বাতিল বা পর্যালোচনা করা সম্ভব। নতুন নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপির উচিত অবিলম্বে জাতীয় সংসদে এই চুক্তি নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করা। দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ এবং দেশপ্রেমিক নাগরিকদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নটি কেবল কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের নয়; এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। বাংলাদেশ কি নিজের পথ নিজে স্বাধীনভাবে বেছে নেবে, নাকি পরাশক্তির প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চলবে—ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে বর্তমান সরকারকেই সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টা রুখে না দিলে, আগামী প্রজন্মের কাছে বর্তমান নেতৃত্বকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category