• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:২৬ অপরাহ্ন
Headline

যমুনা সেতুতে তীব্র যানজট: ৭ ঘণ্টার পথ ১৯ ঘণ্টায়

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

পবিত্র ঈদের ছুটি শেষে নাড়ির টান ছিঁড়ে কর্মস্থলে ফেরার তাড়া ছিল সবার বুকেই। ঘরে ফেরার আনন্দ আর পরিবারের সাথে কাটানো মধুর স্মৃতির রেশটুকু নিয়েই লাখো মানুষ রওনা হয়েছিল কর্মস্থলের উদ্দেশে। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের সেই আনন্দঘন স্মৃতি মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেছে যমুনা সেতু এবং এর দুই প্রান্তের এক অন্তহীন ও দুঃসহ ভোগান্তির মহাসমুদ্রে। দীর্ঘ যানজট, তীব্র গরম আর সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অস্বস্তিকর অপেক্ষার কারণে ঈদের চিরচেনা এই আনন্দ রূপ নিয়েছে এক চরম ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতায়। মূলত গত ২৪ মে থেকেই যমুনা সেতু রুটে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ শুরু হয়েছিল, যা ঈদের আগে ঘরমুখো যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছিল। তবে ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা মানুষের অনিয়ন্ত্রিত ঢল নামায় সেই সংকট এখন আরও প্রকট ও জটিলাকার রূপ ধারণ করেছে, যা পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কার্যত অচল করে দিয়েছে।

এক মায়ের চরম ভোগান্তির বাস্তব চিত্র

এই চরম অব্যবস্থাপনা ও দুর্ভোগের এক জীবন্ত উদাহরণ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বাসিন্দা সুলতানা মাহারাবি। তিনি গত শুক্রবার তাঁর দুই অবুঝ শিশুসন্তানকে সাথে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে দিনাজপুর থেকে ঢাকা পৌঁছাতে সর্বোচ্চ সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগার কথা, সেখানে এই মহাসড়কের বিশৃঙ্খলার কারণে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লেগেছে দীর্ঘ ১৯ ঘণ্টা। শুক্রবার দুপুর ২টায় নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা বিলম্বে বাস ছাড়ার পর থেকেই শুরু হয় তাঁর অন্তহীন যাত্রার ক্লান্তি। প্রথমে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ধীরগতির মুখে পড়ার পর সিরাজগঞ্জে এসে বাসের চাকা কার্যত পুরোপুরি থমকে যায়। বিকেল ৫টা থেকে শুরু করে রাত পৌনে ১২টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের নলকা থেকে সায়দাবাদ অংশে বাসটি একচুলও নড়েনি। গভীর রাতে কোনোমতে যমুনা সেতুতে উঠতে পারলেও ঢাকা শহরের বুকে যখন বাসটি এসে পৌঁছায়, তখন ঘড়িতে ভোর ৫টা বেজে গেছে।

“তীব্র গরমের মধ্যে দুপুর থেকে শুরু করে পরদিন ভোর পর্যন্ত দুই শিশুকে নিয়ে বাসের সরু সিটে বসে থাকতে হয়েছে, যা ছিল এক অমানবিক কষ্ট। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে বাচ্চারা বারবার কান্না করছিল, কখনো তেষ্টায় পানি চাইছিল আবার কখনো ছটফট করে বাস থেকে নেমে যাওয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছিল। কখন যে এই নরকযন্ত্রণা শেষ হবে এবং আমরা গন্তব্যে পৌঁছাব, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছিল না।”

সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে অন্তহীন অপেক্ষা ও তাপপ্রদাহ

সুলতানা মাহারাবির এই যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গত কয়েক দিনে উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী ও ঢাকামুখী হাজার হাজার সাধারণ যাত্রীর ভাগ্যলিপি ছিল ঠিক একই রকম। এই মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন অবুঝ শিশু, নারী, বৃদ্ধ এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীরা, যাদের দীর্ঘ ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বাসের ভেতরেই অবরুদ্ধ থাকতে হয়েছে। আজ শনিবার সকাল থেকে দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের সায়দাবাদ, মুলিবাড়ি এবং কড্ডা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে ধীরগতির যান চলাচল এবং মাইলের পর মাইল বিস্তৃত তীব্র যানজট। যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড় থেকে শুরু করে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল শত শত যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, মাইক্রোবাস এবং ব্যক্তিগত ছোট গাড়ি। প্রচণ্ড রোদে ও গুমোট গরমে বাসের ভেতরের পরিস্থিতি এক হাঁসফাঁস অবস্থায় রূপ নেয়, যেখানে বাতাস পাওয়ার আশায় যাত্রীরা জানালার পাশে ভিড় করছেন এবং অনেকে নিরুপায় হয়ে শিশুদের একটু স্বস্তি দিতে বাসের বাইরে রাস্তার পাশে নেমে অপেক্ষা করছেন।

টোল প্লাজার সক্ষমতা ও শতশত দুর্ঘটনার জটলা

এই নজিরবিহীন সংকটের পেছনে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের পাশাপাশি যমুনা সেতুর ওপর ঘটা একের পর এক ছোটখাটো দুর্ঘটনাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। যমুনা সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন শাখার স্থানীয় নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজউদ্দিন বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান যে, উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী লেনের যান চলাচল দুপুরের পর থেকে কিছুটা স্বাভাবিকের দিকে এলেও বিপরীত দিকে অর্থাৎ উত্তরাঞ্চলগামী লেনে এখনো যানবাহনের ব্যাপক ও অস্বাভাবিক চাপ বজায় রয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, যমুনা সেতুর দুই প্রান্তে মহাসড়কের চার থেকে ছয়টি লেনের গাড়ি একসাথে এসে যখন টোলপ্লাজার সামনে জড়ো হচ্ছে, তখন এক বিশাল জটলার সৃষ্টি হচ্ছে। টোল প্লাজায় বর্তমানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ১৮টি বুথ সার্বক্ষণিকভাবে চালু রাখা সত্ত্বেও সেতুরও নিজস্ব ধারণক্ষমতার একটি সুনির্দিষ্ট সীমা থাকার কারণে আসা সমস্ত গাড়িকে একসাথে পারাপার করানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

নির্বাহী প্রকৌশলী আরও জানান, গত কয়েক দিনে মাত্রাতিরিক্ত গাড়ির চাপের কারণে সেতুর ওপরেই প্রায় দুই থেকে তিন শতাধিক ছোটখাটো ধাক্কাধাক্কির দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিয়মানুযায়ী একটি দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত যানটিকে সড়ক থেকে সরিয়ে নিতে সামান্য কয়েক মিনিট সময় লাগলেও, পেছনের গাড়ির চেইন রিঅ্যাকশনের কারণে তার ক্ষতিকর প্রভাব সেতুর দুই পাড়ে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটের জন্ম দিচ্ছে। তবে এই তীব্র সংকটের মধ্যেও গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা সেতু দিয়ে রেকর্ডসংখ্যক ৪০ হাজারেরও বেশি যানবাহন পারাপার হয়েছে এবং এই সময় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টোল আদায় হয়েছে এক অবিশ্বাস্য অঙ্কের অর্থ, যার পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকারও বেশি।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ‘বটলনেক’ সংকট

তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরা মনে করছেন, এই বার্ষিক দুর্ভোগের মূলে কেবল গাড়ির চাপ বা দুর্ঘটনাই নয়, বরং আমাদের কাঠামোগত ও অবকাঠামোগত তীব্র সীমাবদ্ধতাই প্রধান কারণ। সেতুর উভয় পাশে দক্ষিণ এশিয়া উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা তথা সাসেক-২ প্রকল্পের আওতায় মহাসড়ক চার লেনে সম্প্রসারণের কাজ বর্তমানে একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যা দুই প্রান্তে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু মূল যমুনা সেতুর ওপর গাড়ির ধারণক্ষমতা বা লেনের সংখ্যা আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। সাসেক-২ প্রকল্পের পরিচালক ড. ওয়ালিউর রহমান এই কাঠামোগত ত্রুটি বা অসঙ্গতিকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি জানান, যমুনা সেতুর ওপরের পুরোনো ও অব্যবহৃত রেললাইনটি সম্পূর্ণ অপসারণ করার পর সেখানে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মিটার ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। এই খালি জায়গাটিকে যদি দ্রুত সংস্কার করে মূল দুই লেনের সড়ক পথের সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া যায়, তবে সেতুর সার্বিক সক্ষমতা এক ধাক্কায় অনেকখানি বাড়ানো সম্ভব এবং এর ফলে দুই প্রান্তের চার লেন মহাসড়কের সুফল যাত্রীরা সরাসরি ভোগ করতে পারবেন।

ড. ওয়ালিউর রহমানের মতে, বর্তমানে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে যমুনা সেতু নিজেই একটি বড় ‘বটলনেক’ বা সংকীর্ণ পথ হিসেবে কাজ করছে, যেখানে এসে চার লেনের দ্রুতগতির গাড়িগুলো হঠাৎ থমকে যায়। যদি এই রেললাইনের ফাঁকা জায়গাটির সম্প্রসারণ কাজ অতি দ্রুত ও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে ভবিষ্যতে প্রতিটি ঈদ বা বড় রাষ্ট্রীয় ছুটির সময়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষের এই একই ধরনের দুর্ভোগ আরও প্রকট এবং অনিয়ন্ত্রিত রূপ ধারণ করবে। স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা টোল আদায়ের পরও অবকাঠামোগত এই সাধারণ রূপান্তরটুকু কেন ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে, তা এক বড় প্রশ্ন। সড়কে সারিবদ্ধ যানবাহনের অন্তহীন লাইন আর বাসের ভেতরে ক্লান্ত মানুষের এই অবর্ণনীয় হাহাকার আবারও প্রমাণ করেছে যে, উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবেশদ্বারটি এখন তার সর্বোচ্চ সক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, যার স্থায়ী ও বৈপ্লবিক সমাধান এখন সময়ের দাবি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category