• রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৪ অপরাহ্ন
Headline
খুলনায় পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকে গুলি করে হত্যা আখতারুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেশে বেড়েছে জ্বর-সর্দির রোগী, ঝুঁকিতে শিশুরা বান্দরবানে শুরু জুমের ধান কাটার উৎসব মদিনায় হুথিদের ড্রোন হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের নিন্দা পথশিশুরা ভালো একটি জীবনের দাবি রাখে: ডেপুটি স্পিকার দুর্যোগ-সংকটে দ্রুত সহায়তা পৌঁছাতে কাজ করছে সরকার: উপদেষ্টা স্বপন আখতারুজ্জামান শুধু জামায়াতের নন, মেহনতি মানুষের নেতা: জামায়াত আমির সরকারি সফরে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছেন সেনাপ্রধান ক্রীড়া কার্ড ও ভাতার জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শঙ্কায় কানাডা!

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্বের দীর্ঘতম সুরক্ষাবিহীন বা সেনামুক্ত সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া দুই পরম মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে কোনো সামরিক সংঘাতের কথা চিন্তা করাও একবিংশ শতাব্দীতে প্রায় অসম্ভব একটি বিষয় বলে মনে হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনশীল ও জটিল প্রেক্ষাপটে সেই অসম্ভবকেই এখন সম্ভাব্য ঝুঁকির তালিকায় স্থান দিয়ে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি নতুন করে সাজাচ্ছে কানাডা সরকার। কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে কোনো সরাসরি সামরিক হামলার ঝুঁকি অত্যন্ত ক্ষীণ হলেও, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সব ধরনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তার রূপরেখা প্রণয়ন করা যেকোনো দায়িত্বশীল সরকারের প্রধান কর্তব্য। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তার বারবার করা ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যের পর দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কে এক নতুন ও অস্বস্তিকর বাস্তবতার জন্ম হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত কানাডার জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক ধরনের চরম মাত্রার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে পরিষ্কারভাবেই বলেছিলেন যে, কানাডার বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহারের কোনো সম্ভাবনা বা ইচ্ছা তার নেই। বরং নিজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি কানাডার ওপর প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশলকেই বেশি প্রাধান্য দেবেন। চলতি সপ্তাহে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে, কানাডার জনগণের সুরক্ষা এবং উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রাম্প অতীতের অন্য যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেছেন। তা সত্ত্বেও, ওটোয়া প্রশাসন কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাকে হালকাভাবে নিচ্ছে না।

সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে প্রথাগত সামরিক বা সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা আক্ষরিক অর্থেই শূন্যের কোঠায়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয়েই সামরিক জোট ন্যাটোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এর পাশাপাশি, উত্তর আমেরিকার আকাশসীমা এবং আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলের প্রতিরক্ষায় এই দুই দেশ কয়েক দশক ধরে নিবিড়ভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে আসছে। নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড বা নোরাড (NORAD)-এর আওতায় দুই দেশের সামরিক বাহিনী যৌথ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, যেখানে দুই দেশের কর্মকর্তারা একই কমান্ড সেন্টারে বসে নিয়মিত অত্যন্ত গোপনীয় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করেন। রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সে দীর্ঘ ৩৪ বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা সাবেক লেফটেন্যান্ট-জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস এ বিষয়ে তার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, তার পুরো সামরিক জীবনে কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডার ওপর হামলার কোনো সম্ভাবনা নিয়ে তাদের কাজ করতে হয়নি। তার মতে, দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাত্রা এতটাই গভীর ও শেকড়বদ্ধ যে, এমন একটি যুদ্ধের কথা কল্পনা করাও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত জটিল।

তবে লেফটেন্যান্ট-জেনারেল কোটস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে আলোকপাত করেছেন। তার মতে, আধুনিক যুগে যুদ্ধ শুধু ট্যাঙ্ক আর যুদ্ধবিমান দিয়ে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনো কানাডার ওপর আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে চায়, তবে তা সরাসরি সামরিক হামলা বা সীমান্ত অতিক্রম দিয়ে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এর বদলে সাইবার হামলা, যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া, কিংবা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধের মতো আধুনিক পদ্ধতিতে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি যুদ্ধাবস্থা তৈরি হতে পারে। বিদ্যুতের গ্রিড, ব্যাংকিং খাত এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর ওপর সাইবার আক্রমণ চালিয়ে একটি দেশকে সামরিক হামলা ছাড়াই পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে অবশ্য দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক সবসময় আজকের মতো এতটা মসৃণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। ১৭৭৫ সালে আমেরিকান বিপ্লবের সময় মার্কিন বাহিনী কানাডার মন্ট্রিয়েল দখল করে নিয়েছিল এবং কুইবেক সিটি দখলেরও জোর চেষ্টা চালিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮১২ সালের ঐতিহাসিক যুদ্ধে তৎকালীন ব্রিটিশশাসিত কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ব্যাপক সামরিক হামলা চালায়। সেই যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ও কানাডীয় বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ঢুকে পড়ে এবং খোদ হোয়াইট হাউসে আগুন ধরিয়ে দেয়, যা মার্কিন ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়ে কানাডা সম্ভাব্য যুদ্ধের একটি গোপন প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। সে সময় কানাডার সামরিক কর্মকর্তারা সাধারণ পর্যটকের ছদ্মবেশে সীমান্তবর্তী মার্কিন শহরগুলোতে ঘুরে ঘুরে সেতু, মহাসড়ক, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, যা ইতিহাসে ‘ডিফেন্স স্কিম নম্বর ওয়ান’ নামে পরিচিত। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রও একসময় কানাডায় আগ্রাসন চালানোর জন্য ‘ওয়ার প্ল্যান রেড’ নামক একটি গোপন সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কানাডা তাদের সামরিক প্রস্তুতির বিদ্যমান ঘাটতি পূরণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একটি আধুনিক সামরিক মডেল বা সিমুলেশন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই তাদের পূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়ে কানাডায় আক্রমণ চালায়, তবে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান ও বড় শহরগুলো মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই মার্কিন বাহিনীর দখলে চলে যেতে পারে। কারণ সামরিক সক্ষমতা এবং সৈন্য সংখ্যার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাহিনীর সামনে কানাডার নিয়মিত বাহিনী অনেকটাই নগণ্য। এমন একটি চরম পরিস্থিতিতে কানাডীয় বাহিনীকে প্রথাগত যুদ্ধের বদলে গেরিলা-ধাঁচের প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হতে পারে। বিশাল বনাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং বরফাচ্ছাদিত আর্কটিক অঞ্চলের ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। সেই সঙ্গে ন্যাটো চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্রিটেন, ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে জরুরি সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা চাইতে পারে ওটোয়া।

তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা এটিও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এমন একটি যুদ্ধ পরিচালনা করা কোনোভাবেই সহজ বা মসৃণ হবে না। কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের গভীর সামরিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক মিল এবং দুই দেশের সেনাদের মধ্যকার নিবিড় পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরেই এমন অভিযানের রাজনৈতিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠতে পারে। মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন কানাডায় বসবাস করেন, ফলে নিজ দেশের মিত্রের ওপর বোমা ফেলার নির্দেশ মার্কিন রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব সংকটের জন্ম দেবে।

কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিটের মতে, যদি কোনো কারণে যুদ্ধ সত্যিই শুরু হয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সবার আগে কানাডার তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে আলবার্টা প্রদেশের বিশাল তেলক্ষেত্রগুলো তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। পাশাপাশি, কানাডার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কমান্ড কাঠামোকে দ্রুত অচল করার দিকেও পেন্টাগন নজর দেবে। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, কানাডার সেনারা সংখ্যাগত দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও মাতৃভূমি রক্ষায় তারা প্রবল ও অভাবনীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার এই তাত্ত্বিক আশঙ্কা সাধারণ কানাডীয়দের মনস্তত্ত্বেও এক ধরনের গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পরিচালিত স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান লেজারের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৩০ শতাংশেরও বেশি কানাডীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা করছেন। একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপ্রিয় দেশের নাগরিকদের মনে এমন ভীতি তৈরি হওয়াটা দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবনতিরই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

পরিশেষে বলা যায়, কানাডার এই সামরিক প্রস্তুতি ও ঝুঁকি পর্যালোচনা কোনোভাবেই আসন্ন যুদ্ধের সরাসরি পূর্বাভাস নয়। বরং এটি হলো এমন এক নতুন যুগের সূচনা, যেখানে দীর্ঘদিনের মিত্রদেরও আর অন্ধভাবে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির চরম মেরুকরণের মধ্যে সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকিগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক পরিকল্পনার আওতায় আনারই একটি বাস্তবসম্মত ইঙ্গিত দিচ্ছে মার্ক কার্নির সরকার। প্রতিবেশী যতই শক্তিশালী এবং বন্ধুভাবাপন্ন হোক না কেন, সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রস্তুতিতে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ বর্তমান কানাডা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category