ইউক্রেন-রাশিয়া দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব ও সরাসরি কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়ে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখতে পুরো সময় জুড়ে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকরেরও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তবে চিঠি পাওয়ার দিনই পুতিন এমন যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা পরিষ্কারভাবে নাকচ করে দিয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিয়েভের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রায় ১ হাজার ৮০০ শব্দের এই দীর্ঘ চিঠিতে জেলেনস্কি চলমান যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইউক্রেন প্রতিদিন তাদের মূল্যবান নাগরিকদের হারাচ্ছে, যা দেশের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পাশাপাশি এই যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে রাশিয়ার সাধারণ জনগণও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এবং দেশটির ভেতরে নানামুখী সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে। জেলেনস্কি চিঠিতে উল্লেখ করেন, ইউরোপের এই যুদ্ধ থামানোর জন্য ওয়াশিংটনের মনোযোগের অপেক্ষায় বসে থাকা দুই দেশের কারোর জন্যই ঠিক হবে না। বরং ইউক্রেন ও রাশিয়ার নিজেদের মধ্যে সরাসরি সংলাপের মাধ্যমেই স্থায়ী শান্তির পথ খুঁজে বের করতে হবে। আলোচনার জন্য তিনি সুইজারল্যান্ড বা তুরস্কের মতো যেকোনো নিরপেক্ষ দেশকে ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই নেতার এই সম্ভাব্য বৈঠককে স্বাগত জানিয়েছেন। ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, পুতিন ও জেলেনস্কি মুখোমুখি আলোচনায় বসলে তা অত্যন্ত ইতিবাচক হবে এবং চলমান সংকটের একটি দ্রুত সমাধানের পথ খুলে দেবে। এর আগে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা জেলেনস্কির চিঠিটি পেয়েছে এবং বিষয়টি প্রেসিডেন্ট পুতিনকে অবহিত করা হবে।
অন্যদিকে, সেন্ট পিটার্সবার্গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহ প্রকাশ করলেও বেশ কিছু কঠোর শর্ত পুনর্ব্যক্ত করেছেন। পুতিন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যেকোনো চুক্তির জন্য উভয় পক্ষকেই বড় ধরনের আপস করতে হবে। এক্ষেত্রে রাশিয়া কর্তৃক অধিকৃত ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল—দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়াকে রাশিয়ার ভূখণ্ড হিসেবে ইউক্রেনকে মেনে নিতে হবে এবং ন্যাটো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সব ধরনের প্রচেষ্টা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। এর পাশাপাশি পুতিন বর্তমান ইউক্রেনীয় প্রশাসনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। কারণ, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে সামরিক আইন জারি থাকায় ২০২৪ সালের পর সেখানে কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
তবে ইউক্রেন সরকার বরাবরই রাশিয়ার কাছে নিজেদের ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার এই দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। কিয়েভের মতে, আগ্রাসকদের কাছে নিজেদের জমি ছেড়ে দিলে তা ভবিষ্যতে রাশিয়ার আরও বড় হামলার ঝুঁকি তৈরি করবে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জেনেভা, আবুধাবি ও ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী শান্তি উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হওয়ায় দুই দেশের যুদ্ধবিরতি আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে আছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনও বিশাল দূরত্ব থাকলেও জেলেনস্কির এই নতুন চিঠি যুদ্ধ অবসানের ঝিমিয়ে পড়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।