• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

পাঁচ সিটিতে প্রার্থী দিলেও নির্বাচনী জোটে ভরসা এনসিপির

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করা দেশের নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এক ভিন্নধর্মী দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করছে। একদিকে দলটি দেশের প্রধান প্রধান সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকার ইউনিটগুলোতে একক প্রার্থী ঘোষণা করে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ভেতরগত বাস্তবতায় তাদের মূল নির্বাচনী ভরসা হয়ে উঠেছে ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোট। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ বড় বড় মহানগরীগুলোর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হওয়া বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন দলটির শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা। ফলে মাঠপর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আসন বা অঞ্চলভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতাই এখন এনসিপির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে।

নির্বাচনী মাঠ গোছানোর কৌশল ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আমেজ ও চরিত্র সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। এখানে মূলত প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, স্থানীয় প্রভাব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। নতুন দল হিসেবে এনসিপির কেন্দ্রীয় স্তরে ব্যাপক পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তৃণমূল বা মাঠপর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো এখনও অনেকটাই নড়বড়ে ও ধীরগতির।

এই সাংগঠনিক ঘাটতি পূরণের জন্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার তাগিদে তারা একক শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে জোটবদ্ধ আন্দোলন বা নির্বাচনী ঐক্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। দলটির একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এখন প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও নির্বাচনের মূল ডামাডোল শুরু হলে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে চূড়ান্ত আসন সমঝোতা করা হবে।

১১ দলীয় জোট ও প্রার্থী ঘোষণার রূপরেখা

এই দ্বিমুখী কৌশল নিয়ে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আরিফুল ইসলাম আদীব রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১ দলীয় জোট যদি ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণার আগেই আলোচনার টেবিলে চূড়ান্ত করা হবে। দেশের বর্তমান পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের মাধ্যমেই সেই চূড়ান্ত রূপরেখা আসবে। তবে জোটের সিদ্ধান্ত আসার পূর্বপর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় দলের মনোনীত প্রার্থীরা এককভাবেই তাদের গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাবেন।

তিনি বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি উদাহরণ টেনে বলেন:

“নির্বাচনের পূর্বে জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোও কৌশলগত কারণে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মহাজোট বা বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে অনেক প্রার্থীকে তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিতে হয়েছিল। এনসিপির বর্তমান একক প্রার্থী ঘোষণার বিষয়টিকেও ঠিক সেই ধরনের একটি প্রাথমিক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।”

পাঁচ সিটির প্রার্থী তালিকা ও তৃণমূলের প্রস্তুতি

জাতীয় নাগরিক পার্টি ইতোমধ্যে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনে তাদের নিজস্ব মেয়র প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে রাজনৈতিক মহলে নিজেদের সক্রিয়তার জানান দিয়েছে। দলটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ ও তরুণ নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মতো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জোনে লড়াই করবেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব নিজেই।

ঢাকার বাইরেও দলটির শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা চলছে। এর অংশ হিসেবে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনে জাতীয় যুবশক্তির প্রধান সমন্বয়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে মহানগর এনসিপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মো. মোবাশ্বের আলী এবং আধ্যাত্মিক নগরী সিলেট সিটি কর্পোরেশনে দলের অন্যতম শীর্ষ সংগঠক আবদুর রহমান আফজালকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশের বাকি সাতটি সিটি কর্পোরেশনেও খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। শুধু বড় শহরগুলোই নয়, তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের বিস্তার ঘটাতে এনসিপি ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের জন্য প্রায় ২০০ প্রার্থীর একটি প্রাথমিক তালিকা চূড়ান্ত করে মাঠে নামিয়েছে।

জোটের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিএনপির ভূমিকা

তবে জোটের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে এক ধরনের সুপ্ত টানাপোড়েন এবং আদর্শিক দূরত্বের আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ জোটের রাজনীতি এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের প্রক্রিয়াকে গতিশীল ও ত্বরান্বিত করার একটি সাধারণ লক্ষ্য নিয়ে ১১টি দল মিলে একটি শক্তিশালী নির্বাচনী সমঝোতা বা জোট গড়ে তুলেছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের প্রধান দল বিএনপির কিছু রাজনৈতিক অবস্থান এই ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির সংস্কারবিরোধী মনোভাব এবং জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদে দলটির পক্ষ থেকে শপথ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত অন্য সংস্কারপন্থী সমমনা দলগুলোকে একটি ভিন্ন বা আলাদা মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আলাউদ্দীন মোহাম্মদ আরও সতর্ক করে বলেন, যদিও ১১ দলের এই রাজনৈতিক জোটটি কাগজে-কলমে এখনও বহাল রয়েছে, তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই জোটগত ঐক্য ধরে রাখা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। কারণ বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হয়ে স্বতন্ত্র বা অদলীয়ভাবে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এর ফলে জোটভুক্ত দলগুলো বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের পছন্দের আলাদা আলাদা প্রার্থী দাঁড় করাতে পারে। যদি জোটের শরিকরা মাঠপর্যায়ে একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই ১১ দলীয় জোটটি চরম দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, এমনকি তা পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

জামায়াত-এনসিপি সমীকরণ ও ভোটের রাজনীতি

এই জটিল সমীকরণের মধ্যেও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক বোঝাপড়া এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপি ও জামায়াতের এই জোটবদ্ধ কৌশল বেশ সফল হয়েছিল এবং তারা সংসদের মোট তিনটি আসনে ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। সেই সফলতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতেই দলটির নীতিনির্ধারকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জামায়াতের সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী ও কৌশলগত সমঝোতাকে সামনে নিয়ে আসছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা মহানগরের উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে যদি এনসিপি ও জামায়াত নিজেদের মধ্যে আসন ভাগাভাগি করে এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে একক প্রার্থী দেয়, তবে তা স্থানীয় রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করবে। জামায়াতও তাদের তৃণমূল সংগঠনকে মাঠপর্যায়ে আরও বেশি সক্রিয় ও চাঙ্গা রাখতে এই তরুণ দলটির সাথে জোটবদ্ধ থাকাকে অত্যন্ত লাভজনক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করছে।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভোটের হাওয়া: সরকারের প্রস্তুতি

দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এতদিন যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ধোঁয়াশা ছিল, সরকারের সাম্প্রতিক একটি ঘোষণায় তা অনেকটাই কেটে গেছে। সিটি কর্পোরেশনগুলোতে দলীয় মেয়রদের অপসারণ করে সরকারি administrator বা প্রশাসক নিয়োগের পর অনেকেই মনে করছিলেন যে হয়তো দ্রুত নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে না। তবে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমাবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দেশের নির্বাচনী রোডম্যাপ স্পষ্ট করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন যে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকেই দেশজুড়ে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিশাল যজ্ঞ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি শুরু হবে মূলত তৃণমূলের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে, প্রয়োজনীয় বাজেট প্রাপ্তি সাপেক্ষে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের মোট পাঁচটি স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে শেষ করা হবে। সরকারের এই নির্বাচনমুখী সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ দেশের অন্যান্য প্রধান political দলগুলো তাদের নির্বাচনী তৎপরতা ও জোটের অংক মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত এই জোটের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার জন্য সবাইকে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category