• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

Reporter Name / ৫ Time View
Update : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়কে সাধারণত একটি নিরেট নিরাপত্তা দুর্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে অতি সম্প্রতি এই কঠোর নিরাপত্তা বলয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঘটে গেছে এক অভাবনীয় চুরির ঘটনা। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির সুযোগ নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দপ্তরের বিশেষ ও অতি সুরক্ষিত ‘লাল টেলিফোন’ বা রেড ফোনের যোগাযোগের তার কেটে চুরি করে নিয়ে গেছে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই চুরির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর সচিবালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সংশয় তৈরি হয়েছে। সাধারণ একটি চুরির ঘটনা হিসেবে না দেখে সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থাকা এই নিরাপত্তা ঘাটতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুন ঈদের ছুটি শেষে সচিবালয়ের দাপ্তরিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলে প্রথম নজরে আসে যে প্রধানমন্ত্রীর রেড ফোনটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখার পর জানা যায়, গত ২২ মে ছুটির দিনে যখন পুরো সচিবালয় জনশূন্য ছিল, তখন ভবনের ছাদ ও বিভিন্ন ব্লকের সংযোগস্থল থেকে প্রায় ৮ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের মূল্যবান তামার তার কেটে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট দ্রুত তদন্তে নামে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ এই চুরির সাথে সরাসরি জড়িত রঞ্জন চন্দ্র (২৬) নামের এক আউটসোর্সিং পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রেজাকুল ইসলাম (৩২) নামের এক ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার গুদাম থেকে চুরি হওয়া সম্পূর্ণ তামার তার উদ্ধার করা হয়। জানা গেছে, রঞ্জন ওই মূল্যবান তার কেটে ভাঙ্গারির দোকানে প্রতি কেজি মাত্র ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করে দিয়েছিল।

এই চাঞ্চল্যকর চুরির ঘটনায় পুরো সচিবালয়ের প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা যেখানে সশস্ত্র পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কড়া পাহারা দেন এবং পুরো এলাকা যেখানে শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে থাকে, সেখানে এত বড় একটি অপরাধ কীভাবে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘটল, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাধারণত অফিস বন্ধ হওয়ার পর সচিবালয়ের ভবনগুলোর চাবি গণপূর্ত বিভাগের নির্দিষ্ট কর্মচারীদের কাছে সংরক্ষিত থাকে এবং সমস্ত প্রবেশদ্বার তালাবদ্ধ করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু একজন সাধারণ আউটসোর্সিং কর্মী কীভাবে সেই তালাবদ্ধ ভবনের ছাদে প্রবেশ করল, দীর্ঘ সময় ধরে তার কাটল এবং কোনো ধরনের তল্লাশি ছাড়াই সেই তারের বোঝা নিয়ে মূল গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল—তা ভাবিয়ে তুলেছে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সচিবালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, যদি প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের তার এভাবে নির্বিঘ্নে চুরি হতে পারে, তবে অন্যান্য সাধারণ মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নিরাপত্তা কতটা অরক্ষিত তা সহজেই অনুমেয়। এই ঘটনা কেবল একটি সাধারণ চুরি নয়, বরং এর পেছনে গভীর কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি বা অভ্যন্তরীণ কোনো বড় অবহেলা জড়িয়ে রয়েছে কি না, তা বের করতে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নেমেছে। সন্দেহভাজন গণপূর্তের কর্মচারী এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সচল নিরাপত্তার স্বার্থে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন, এই ঘটনার পর ভেতরের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। বিশেষ করে সচিবালয়ের ভেতর অবস্থিত বিভিন্ন ক্যান্টিন, দোকান ও রেস্তোরাঁর মালিক ও কর্মচারীদের ওপর কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আনা হতে পারে। কারণ প্রায়শই দেখা যায়, এসব সংগঠনের কর্মসূচির নামে সচিবালয়ের বাইরের বিভিন্ন দপ্তরের বিপুলসংখ্যক বহিরাগত মানুষকে ভেতরে জড়ো করা হয়, যা সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

প্রশাসনের একজন উপসচিব জানিয়েছেন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া অস্থায়ী কর্মীদের সঠিক কোনো ডেটাবেজ বা সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার শিডিউল না থাকাটা এই ধরনের অপরাধের জন্য পথ সুগম করছে। প্রতিদিন সকালে শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ভেতরে প্রবেশ করলেও তারা ঠিক কী জিনিস নিয়ে ঢুকছেন কিংবা কাজ শেষে কী নিয়ে বের হচ্ছেন, তা কঠোরভাবে তদারকি করার জন্য কোনো স্বয়ংক্রিয় বা ডিজিটাল ব্যবস্থা নেই। এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন থেকে আউটসোর্সিং কর্মীদের কঠোর স্ক্রিনিং, নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার জোর দাবি উঠেছে, যাতে দেশের এই সর্বোচ্চ প্রশাসনিক হৃদপিণ্ডের নিরাপত্তা আর কখনোই এভাবে বিঘ্নিত না হয়।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category