বাংলাদেশ ও ভারতের বিস্তীর্ণ সীমান্তজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক জোরপূর্বক পুশ ইন বা পুশ ব্যাকের তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বিএসএফের এই একতরফা আচরণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে। বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের কড়া নজরদারির কারণে বেশ কয়েকটি অনুপ্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া সম্ভব হলেও সীমান্তজুড়ে একটি থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
কূটনৈতিক ও সীমান্ত সূত্রগুলো বলছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বড় জয় লাভ করে সরকার গঠনের পর থেকেই এই সংকটের সূত্রপাত। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার পরপরই অনথিভুক্ত বা তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দেন এবং তাদের আটকে হোল্ডিং সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। এর আগে আসাম ও ত্রিপুরা সীমান্তে এই তৎপরতা বেশি দেখা গেলেও এখন পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ ২,২১৬ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে বিএসএফের কঠোর ও আগ্রাসী মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার রেশ ধরেই এই পুশ ইনের ঘটনাগুলো বর্তমান সময়ে তীব্র রূপ নিয়েছে। এর আগে তৃণমূল কংগ্রেসের মেয়াদে এই প্রবণতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।
গত কয়েক দিনে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে বিএসএফের মরিয়া চেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে গভীর রাতে নারী ও শিশুসহ ২৮ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয় বিএসএফ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গ্রাম পুলিশের সহায়তায় তাদের আটক করে পুনরায় সীমান্ত পার করে জিরো লাইনে ফেরত পাঠানো হয়।
প্রায় একই সময়ে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে একটি প্রিজন ভ্যানে করে ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তিকে এনে আন্তর্জাতিক সীমান্ত গেট খুলে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবির টহল দল ও স্থানীয়দের কঠোর প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ তাদের পুনরায় ভ্যানে তুলে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এর আগে মে মাসের শেষের দিকেও যশোরের বেনাপোলের রঘুনাথপুর সীমান্তে প্রায় শতাধিক মানুষকে জড়ো করে পুশ ইনের চেষ্টা চালানো হয়েছিল, যা বিজিবির তাৎক্ষণিক বাধায় পণ্ড হয়ে যায়।
এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি দেশের ৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে প্রায় ৭০টি ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে। যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, নওগাঁ, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম এবং সিলেটের মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর এসব পয়েন্টে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েনের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধভাবে যাতে কোনো বহিরাগত ব্যক্তি দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামগুলোতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। বিজিবি-৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়কেরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বিএসএফের এই একতরফা পুশ ইনের চেষ্টা কোনোভাবেই সফল হতে দেওয়া হবে না।
বিজিবির অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে ২,৩৪৪ জনকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশ ইন করা হয়েছিল। মাঝখানে কয়েক মাস এই প্রক্রিয়া বন্ধ থাকলেও মে মাস থেকে পুনরায় তা নতুন করে শুরু হয়েছে। পুশ ইনের পাশাপাশি সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিকদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫ সালে বিএসএফের গুলিতে ও নির্যাতনে মোট ৩৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগের বছরগুলোতেও এই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল আশঙ্কাজনক, যা সীমান্ত সুরক্ষায় ভারতের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
চলতি এই উত্তেজনা এবং একতরফা পুশ ইনের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কোনো ধরনের নিয়মনীতিহীন পুশ ইন বা পুশ ব্যাক বাংলাদেশ মেনে নেবে না। যেকোনো নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক ও দ্বিপক্ষীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ভারতের নতুন দিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের চার দিনব্যাপী একটি দ্বিপক্ষীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিজিবি সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এবারের বৈঠকে একতরফা পুশ ইন এবং নির্মম সীমান্ত হত্যা বন্ধের বিষয়টিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এক নম্বর অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা করা হবে এবং ভারতকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন মেনে চলার জোরালো তাগিদ দেওয়া হবে।
তথ্যসূত্র: আজকের কাগজ