দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার যে মহোৎসব চলে আসছে, তার নেপথ্য কাহিনী এখন এক ওপেন সিক্রেট। সরকারের পক্ষ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন সময়ে উচ্চকিত বক্তব্য ও নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই এই লুণ্ঠিত সম্পদ দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনতে সফল হয়নি। এই কাঠামোগত ব্যর্থতার দায় কার কাঁধে বর্তায়, কীভাবে সুকৌশলে এই অর্থ বাইরে পাচার করা হয় এবং এর সঙ্গে কারা সরাসরি জড়িত—সে বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উন্মোচন করা হয়েছে। দেশের নামী-দামি শিল্পগোষ্ঠী, শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং অর্থ পাচার রোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বয়ং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই জড়িয়ে রয়েছে এই গোপন নেটওয়ার্কের সঙ্গে।
অর্থ পাচারের ধরণ ও এর পথগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বিশাল অবৈধ অর্থের উৎস মূলত তৈরি হয় বিভিন্ন উপায়ে যেমন—ঘুষ বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, ব্যাংক খাত থেকে ভুয়া ও বেনামি ঋণ জালিয়াতি এবং নানা ধরনের আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে। এরপর সেই কালো টাকাগুলো মূলত চারটি প্রধান করিডোর বা মাধ্যম ব্যবহার করে খুব সুকৌশলে দেশ থেকে বের করে নেওয়া হয়। মাধ্যমগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং, ঐতিহ্যবাহী বা কর্পোরেট হুন্ডি নেটওয়ার্ক, ব্যাংকিং চ্যানেলের সুপ্ত কারসাজি এবং সর্বাধুনিক ক্রিপ্টোকারেন্সির ডিজিটাল লেনদেন। প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থ পাচারকারীরা এই অবৈধ অর্থের প্রকৃত মালিকানা বা সোর্স অব ফান্ড নিখুঁতভাবে গোপনের জন্য অফশোর শেল কোম্পানি, নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেনামি প্রতিষ্ঠান, ডামি মালিক এবং বহুস্তর বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক জটিল লেনদেনের জাল বিস্তার করে।
সকল গোপনীয়তা রক্ষা করে যখন অর্থের প্রকৃত মালিকানা বা গন্তব্য সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যায়, ঠিক তার পরেই নড়েচড়ে বসে অর্থ পাচার রোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী সংস্থাগুলো। কখনো কখনো কিছু সম্পদ চিহ্নিত করা হয় কিংবা অন্য কোনো দেশের আইনি সহায়তায় কিছু হিসাব জব্দ করা হয়। কিন্তু মালিকানার আইনি সত্যতা প্রমাণ করার চরম জটিলতা, একাধিক দেশের ভিন্ন ভিন্ন ও পরস্পরবিরোধী বিচারিক এখতিয়ার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে ওই পাচার হওয়া অর্থ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা এক অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে বাংলাদেশ মূলত দুবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়—প্রথমবার তার কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ও আমানত হারিয়ে শূন্য হাতে পড়ে, এবং দ্বিতীয়বার সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের সমস্ত আইনি লড়াই ও সুযোগ চিরতরে হারিয়ে নিঃস্ব হয়।
পাচার হওয়া অর্থের এই বিশাল পসরা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট সিস্টেমে এটি ঘটে চলেছে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যদি এর মধ্যে সবচেয়ে ন্যূনতম বা সর্বনিম্ন অঙ্কটি ধরি, তবুও বিগত মাত্র চার বছরে যত টাকা দেশ থেকে পাচার হয়েছে, তা বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মোট পরিমাণের সমান। উন্নয়নশীল বা তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যই এখানে অর্থ পাচারের সবচেয়ে বড়, প্রধান এবং সবচেয়ে কম দৃশ্যমান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। লাগেজে করে কোটি কোটি নগদ ডলার ব্যাগে ভরে নিয়ে যাওয়ার দিন এখন শেষ; এখন শত শত মিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হচ্ছে কোনো বৈধ আমদানি বিল, রপ্তানি চালান কিংবা ব্যাংকিং লেনদেনের মোড়ক লাগিয়ে।
বিশ্বের খ্যাতনামা আর্থিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির সর্বশেষ বিশ্লেষণ বলছে, প্রতিবছর যত পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়, তার প্রায় অর্ধেকই কেবল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভুল ইনভয়েসিং বা বাণিজ্য কারসাজির মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোতে পাচার করা হয়। বাংলাদেশের রেডিমেড গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাক খাতের সিংহভাগ পণ্যই রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো উন্নত দেশগুলোতে। আবার এই খাতের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, সুতা, কাপড় এবং ভারী যন্ত্রপাতিও আমদানি করা হয় সেই দেশগুলো থেকেই। অথচ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বাণিজ্যের আড়ালে এই বিশাল অর্থ পাচারের নগ্ন চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। গবেষকরা দেখাচ্ছেন যে, ব্যাংকিং খাত থেকে এই খাতে বিতরণকৃত প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার ঋণের প্রায় অর্ধেকই আজ খেলাপির খাতায় নাম লিখিয়েছে, যার পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে এই বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রকৃত ব্যবসা করার জন্য কোনো ঋণ নেওয়া হয় না; বরং ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলন করে সরাসরি সেটি বিদেশে পাচার করাই থাকে মূল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যখন ব্যাংক থেকে লোন বা ঋণ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয় কিংবা সরাসরি দেশ থেকে পাচার করা হয়, তখনই সেই লোনগুলো বাধ্য হয়ে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) দুই ডজনেরও বেশি গোপন তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাচারকারীরা যুগের পর যুগ ধরে একই পুরোনো ও নতুন কৌশল অত্যন্ত সুচারুভাবে বারবার প্রয়োগ করে আসছে।
এমন কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রমাণ মিলেছে যেখানে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে পণ্যের গন্তব্য এক দেশ দেখানো হলেও তার বিপরীতে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে সম্পূর্ণ অন্য একটি দেশ থেকে। আবার কখনো কখনো লেনদেনগুলো পরিচালনা করা হয়েছে একই মূল ব্যবসায়িক গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন বিদেশি সহযোগী কোম্পানির সঙ্গে। দেশীয় একটি শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারক ও বিপণনকারী কনগ্লোমারেট সম্প্রতি তাদের নিজস্ব ইন-হাউস ট্রেডিংয়ের মারপ্যাচে প্রায় ৪০৫ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৩ মিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার করার এক দুঃসাহসিক চেষ্টা চালিয়েছিল। ওই করপোরেট গ্রুপটি তাদের একটি দেশীয় কোম্পানির নামে সিঙ্গাপুরে অবস্থিত তাদেরই আরেকটি বেনামি বা নিজস্ব কোম্পানির কাছ থেকে একটি জাহাজ আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খোলে।
সিঙ্গাপুরের সেই সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি আবার ঠিক একই জাহাজটি কিনেছিল মার্শাল আইল্যান্ডে নিবন্ধিত সম্পূর্ণ একই ব্যবসায়িক গ্রুপের আরেকটি অফশোর কোম্পানির কাছ থেকে। অর্থাৎ, একই গ্রুপের তিনটি ভিন্ন কোম্পানির মধ্যে পরপর তিনটি সাজানো বা ভুয়া লেনদেনের মাধ্যমে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করার পাঁয়তারা করেছিল, যা শেষ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তীক্ষ্ণ নজরদারিতে আটকে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার নথিপত্র থেকে জানা যায়, এই অভিযুক্ত শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীটির অধিকাংশ বড় বড় কারখানা ও প্লান্ট নারায়ণগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত। তদন্তকারীরা বলছেন, একটি একক গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে এই ধরনের অভ্যন্তরীণ পারস্পরিক বাণিজ্য বা ক্রস-বর্ডার ট্রেড সাধারণ মানুষের চোখে এক ধরনের আইনি বৈধতার আবরণ তৈরি করে দেয়।
এর ফলে লেনদেনটি আসলে কোথা থেকে শুরু হলো, টাকাগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পৌঁছাল এবং পর্দার আড়ালে এর প্রকৃত নিয়ন্ত্রক বা মাস্টারমাইন্ড কে—তা খুঁজে বের করা তদন্তকারীদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণেই কোনো অসৎ ব্যবসায়ীর বিদেশে লুকিয়ে থাকা স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও, তা আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা এক বন্ধুর পথ হয়ে দাঁড়ায়। দেশের বাইরে থেকে অর্থ বা সম্পদ পুনরুদ্ধার করতে হলে আন্তর্জাতিক আদালতে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করতে হয় যে ওই সম্পদ বা অর্থ কেবল বাংলাদেশেরই পাচার করা লুণ্ঠিত সম্পত্তি। আর তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এই আইনি প্রমাণের কাজটিই হলো পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন এবং জটিলতম অংশ।
বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর্পোরেট হুন্ডি নেটওয়ার্কও অর্থ পাচারের অন্যতম প্রধান ও অপ্রতিরোধ্য মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদ্য সমাপ্ত একটি বিশেষ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, সরকারের সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর নামে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ঠিক একই ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি অবলম্বন করে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করার পর সেই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই হুন্ডি ব্যবসায়ীরা সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়, কারণ তারা এই অবৈধ নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বস্ত কর্মকর্তা, ঘনিষ্ঠ সহচর কিংবা অদৃশ্য শেল কোম্পানিগুলোকে ব্যবহার করে থাকে।
বাংকিং চ্যানেলের অপব্যবহারও বর্তমানে অর্থ পাচারের আরেকটি রুট হিসেবে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক সম্প্রতি অর্থ পাচারে সরাসরি সহযোগিতা করার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ৩০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। ব্যাংকটি মূলত দেশের অটোমোবাইল বা মোটরযান ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একটি শীর্ষস্থানীয় ট্রেডিং গ্রুপের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে। এছাড়াও আরও অন্তত চারটি বেসরকারি, মালিন্টানাসওনাল এবং সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের সন্দেহজনক কার্যক্রমে অর্থ পাচারের প্রত্যক্ষ সংযোগের শক্ত প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শক দল।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি চৌকস তদন্ত দল দেশের ছয়টি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বা ফরেন কারেন্সি লেনদেনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করেছে। বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এক সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে তাদের এই দীর্ঘ তদন্তে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক লেনদেনে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক ট্রানজেকশনের বহু প্রমাণ মিলেছে। আরেকটি পৃথক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের একটি প্রধান মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, একটি বেসরকারি ব্যাংক এবং দুটি মানি এক্সচেঞ্জ হাউজের সমন্বয়ে তৈরি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অন্তত ৪০৭ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অতীতে এই ব্যাংকটি গাজী গ্রুপের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো।
তদন্তকারীদের দৃঢ় ধারণা, যদি সংশ্লিষ্ট এমএফএস প্রতিষ্ঠান এবং ওই এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর বিগত দিনের সমস্ত লেনদেনের হিসাব নিরপেক্ষভাবে অডিট করা হয়, তবে পাচার হওয়া অর্থের এই পরিমাণ কয়েকগুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রচলিত আইনে বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল কারেন্সির লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বেআইনি হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন অনলাইন ও অফলাইন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন অবলীলায় সম্পন্ন হয়ে চলেছে। তদন্তে দেখা গেছে, বাংলাদেশের যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক কিংবা এমএফএস অ্যাকাউন্ট থেকে খুব সহজেই এই সমস্ত ক্রিপ্টো অ্যাপে টাকা জমা দেওয়া এবং তা বিদেশে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এর পাশাপাশি অনলাইন জুয়া বা বেটিংয়ের মাধ্যমেও প্রতিদিন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও দেশীয় মুদ্রা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। জুয়ার এই অবৈধ রমরমা কারবার এমন এক ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন সাবেক ছাত্র উপদেষ্টার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও একাধিক অনলাইন জুয়ার বড় অঙ্কের লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। সাবেক ওই উপদেষ্টা যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি ব্যক্তিগত লেনদেনের জন্য ব্যবহার করতেন, সেটি দুটি দেশের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে পরিচালিত হতো। বিশেষ করে সাবেক এই উপদেষ্টা ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি বা এনসিপির অত্যন্ত প্রভাবশালী ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত।
অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পাচার হওয়া প্রায় ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার সম্প্রতি ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন বিভাগ বা সিআইডি সফলভাবে উদ্ধার করেছে। তবে সিআইডির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, তাদের কাছে আধুনিক ব্লকচেইন-অ্যানালাইসিস সফটওয়্যার বা উন্নত প্রযুক্তি না থাকায় ক্রিপ্টো লেনদেনের বড় একটি অংশই এখনো তাদের শনাক্তের সীমার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিএফআইইউ বা আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ ধরনের অত্যাধুনিক সফটওয়্যার কেনার জন্য প্রস্তাব পাঠালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ জটিলতায় সেই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
গত দুই বছর ধরে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য এবং বিদ্যমান পাচার চক্রের শক্ত শিকড় ভেঙে ফেলার জন্য রাষ্ট্র রাষ্ট্রীয় কৌশল পরিবর্তন করলেও সম্প্রতি তারা প্রায় ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩০৬ কোটি টাকার একটি বিশাল অঙ্কের পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেছে। এই একটিমাত্র ঘটনা বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা তথা বিএফআইইউর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও চরম অদক্ষতার চিত্রটি পুরোপুরি উন্মোচন করে দিয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা নিজস্ব অনুসন্ধানে বাংলাদেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের পাচার করা ২৫ মিলিয়ন ডলার লন্ডনে শনাক্ত করে এবং ঢাকাকে তা আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে মাত্র চার সপ্তাহের জন্য সেই অর্থ সম্পূর্ণ ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিএফআইইউ ওই নির্দিষ্ট চার সপ্তাহের ডেডলাইনের মধ্যে কোনো কার্যকর আইনি পদক্ষেপ বা রিট ফাইল করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, যার ফলে অবরুদ্ধ থাকা ওই বিপুল পরিমাণ অর্থ পরবর্তীতে খুব সহজেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করে দেওয়া হয়। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ‘ট্যাক্স হেভেন’ বা করের স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ফলে সেখান থেকে এই লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার করা এখন আরও বহুগুণ বেশি জটিল ও দুরূহ এক আইনি লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। যদি বিএফআইইউ সময়মতো সঠিক ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে এই অর্থ সফলভাবে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারত, তবে তা হতো সংস্থাটির প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত অর্জিত ইতিহাসের প্রথম কোনো সফল মানি লন্ডারিং রিকভারি বা অর্থ উদ্ধার।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের বা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশের এই অর্থ পুনরুদ্ধারের বর্তমান সামগ্রিক কার্যক্রমকে কোনোভাবেই পর্যাপ্ত বা সন্তোষজনক বলে মনে করেন না। তার মতে, পাচার হওয়া অর্থ আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির বেড়াজাল পেরিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছু জন্মগত ও বাস্তবসম্মত আইনি জটিলতা সবসময়ই বিদ্যমান থাকে। তবে দুটি বন্ধুভাবাপন্ন বা সার্বভৌম রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করে খুব সহজেই এই আইনি জটিলতাগুলো কাটিয়ে প্রক্রিয়াটি অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
আমাদের দেশের বিদ্যমান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধীর জন্য পাচার করা অর্থের দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থদণ্ড এবং চার থেকে বারো বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের কঠোর বিধান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত রাষ্ট্র এই বড় বড় আর্থিক অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা ও কঠোর জেলের সাজা নিশ্চিত করতে পারছে, ততক্ষণ কোনোভাবেই এই মহামারী রোধ করা সম্ভব হবে না।