রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি এবং চরম ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের চিত্র। পাম্পগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভিড় জমাচ্ছেন মোটরসাইকেল চালকরা। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনার হিড়িক বলা হলেও, অপর্যাপ্ত পাম্প এবং বিপুল সংখ্যক বাইকের কারণে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বেশ ভয়াবহ।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা: ৮০ পাম্প বনাম ১২ লাখ বাইক
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ, যার ৭৫ শতাংশই (৪৮ লাখের বেশি) মোটরসাইকেল। শুধু ঢাকাতেই নিবন্ধিত ২২ লাখ যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেল রয়েছে প্রায় ১২ লাখ। এর বাইরেও রাইড শেয়ারিংয়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অসংখ্য বাইক ঢাকায় চলাচল করে।
বিপুল এই মোটরসাইকেলের জ্বালানি মেটানোর জন্য বিপিসির হিসেবে ঢাকায় পেট্রোল পাম্প রয়েছে মাত্র ৮০টি (সারাদেশে ২,৩২৯টির মধ্যে)।
গাণিতিক হিসাবে সংকটের মূল কারণ
ঢাকায় যদি প্রতিদিন গড়ে ৪ লাখ মোটরসাইকেলও চলাচল করে (যার অর্ধেক রাইড শেয়ারিং), তবে হিসাব অনুযায়ী রাজধানীর প্রতিটি পাম্পে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ২৩২টি বাইক তেল নিতে ভিড় করে।
একটি পাম্প যদি ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে এবং প্রতি মিনিটে একটি করে বাইকে তেল দেয়, তবে দিনে সর্বোচ্চ ১,৪৪০টি বাইককে তেল দেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, প্রতিটি পাম্পে দৈনিক প্রায় ৭৯২টি বাইক তেল পাওয়া থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। এর ওপর, বর্তমানে বেশিরভাগ পাম্প ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকছে না, বরং সন্ধ্যায়ই ‘তেল শেষ’ নোটিশ ঝুলিয়ে দিচ্ছে। আগে পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে খোলা তেল পাওয়া গেলেও, সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে সেগুলো বন্ধ থাকায় পাম্পের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়েছে।
তেল নিয়ে কালোবাজারি ও নতুন ব্যবসা
এই সংকটের সুযোগে একশ্রেণির অসাধু চক্র নতুন ব্যবসার ফাঁদ পেতেছে। অনেক বাইকার অভিযোগ করেছেন, কিছু রাইডার পাম্প কর্মীদের সাথে যোগসাজশ করে নিজেদের বড় ট্যাংকে তেল ভরছেন। পরে সেই তেল বের করে দুই লিটারের বোতলে ভরে পরিচিত বা বিপদে পড়া বাইকারদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করছেন (২ লিটার অকটেন ৫০০ টাকা)। অনেকেই রাইড শেয়ারিং ছেড়ে দিয়ে এই অবৈধ তেল ব্যবসার মাধ্যমে দিনে ৪-৫ হাজার টাকা আয় করছেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা এই সংকটের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, প্যানিক বায়িং, নজরদারির ঘাটতি এবং চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহকে দায়ী করছেন।
সমাধানের পথে ‘ফুয়েল অ্যাপ’ ও কিউআর কোড
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, পাম্পে মোটরসাইকেলের অস্বাভাবিক চাপ কমাতেই মূলত ‘ফুয়েল অ্যাপ’ ও কিউআর কোড পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, “আমাদের প্রধান সমস্যা এখন বাইক। প্রতিটি বাইকারকে কিউআর কোড দেওয়া হচ্ছে। এটি স্ক্যান করলে তার নির্দিষ্ট কোটার তেল সে পাবে এবং ওই দিন অন্য কোনো পাম্প থেকে আর তেল নিতে পারবে না।”
ইতিমধ্যে ঢাকার ১৮টি পাম্পে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে এবং নতুন করে আরও ১৯টি জেলায় এটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ বাইকাররাও মনে করছেন, এই অ্যাপটি দ্রুত সব বাইকারের জন্য বাধ্যতামূলক করা হলে জ্বালানি তেলের এই চরম ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে।