• সোমবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০২:০৯ পূর্বাহ্ন
  • Bengali BN English EN

রাজনীতির ফাঁদ-ফাঁসে আমজনতা

Reporter Name / ১৩ Time View
Update : সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৩

-রিন্টু আনোয়ার

বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলো যে যাকে যেভাবে পারছে ফাঁসাচ্ছে, ফাঁদে ফেলছে।তাদের এ ফাঁস-ফাঁদে বলি হওয়াদের নাম পুলিশ, হেলপার, যুবলীগ, যুবদল ইত্যাদি। এ ধরনের নামাবলিতে তাদের আর মানুষের মর্যাদা মিলছে না। রাজনীতির বলি হয়ে যাওয়ার পর তারা কেবলই লাশ। আর পরিচয় দল, লীগ, ড্রাইভার,হেলপার। তাদের শাহাদাৎ হয় না। যারা মরে বা মারা যায় তাদের স্বজন, সন্তানরাও খবরের আইটেম হয় না।  এর দায়ও কারো নিতে হয় না। ফলে লাভবান উভয় পক্ষই!
এভাবেই যুগের পর যুগ দেশের সরকারী দল আর বিরোধী রাজনৈতিক দল গুলো চালিয়ে যাচ্ছে একে অপরকে ফাঁদে ফেলার অসম প্রতিযোগিতা! যদিও বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ বিএনপিকে কোনো ফাঁদে ফেলছে না বা কোনো প্রলোভনও দেখাচ্ছে না আবার বিএনপিসহ বিরোধীরা বলছেন, ‘আমরা সরকারের কোন পাতানো ফাঁদে পা দিচ্ছি না।
অথচ এখন সাধারণ জনগণ সহজেই রাজনীতির ভালো-মন্দ বুঝতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের প্রসার। এখন মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্যে কিংবা ভুল তথ্য দিয়ে রাজনীতিতে লাভবান হওয়া কঠিন।
সেদিন ২৮ অক্টোবরের কথিত উচ্ছৃঙ্খল জনতা বা অঘটনঘটিয়সিদের কাছে আমিনুল পারভেজ শুধুই পুলিশ। বিরোধীদলের কাছে সরকারি লাঠিয়াল। যে গায়েবি মামলা দেয়। গুম বা ক্রসফায়ার করে, বিরোধী দলের লোকজনকে বেধড়ক পেটায়। তা কার নির্দেশে, কেন তা এই উচ্ছৃঙ্খল জনতা কখনো ভাবে না। আর পুলিশের কাছে আন্দোলনরত মানুষগুলো শুধুই উচ্ছৃঙ্খল জনতা। ঠিক গুম, ক্রসফায়ারে নিহতরা যেমন কাগজে-কলমে মাদক ব্যবসায়ী, গুন্ডা, অস্ত্রবাজ। কার নির্দেশে, কেন তারা মহাঅপরাধী? কে ওপরের নির্দেশকারী? সেই নির্দেশ পালনকারী পুলিশ তা জানে না। মোটকথা দু’পক্ষই মরার তালিকার আমজনতা।
যুগযুগ ধরে ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির এটাই বাস্তবতা।  তারা তাদের প্রয়োজনে সবকিছু করে। করতে পারে। পারলে লাশের আবাদও করে। রাজনীতির উদ্দেশ্য মানবিক ও  জনকল্যাণমুখী হলে মোটেই এমনটা হতো না। অর্থ, বিত্ত আর প্রভাব-প্রতিপত্তির মোহের রাজনীতি এ নিষ্ঠুরতার কর্তৃত্বপরায়ণের তালিমই দেয়। আর জোর করে বা সাধারন মানুষকে ঠকিয়ে ক্ষমতাবান থাকার মধ্যে এই শ্রেণিটি কোনো লাজ বা গ্লানি দেখে না। গৌরব দেখে।
তা  বিএনপি কর্মী ভোলার রহিম আর কক্সবাজারের একরাম হোক।  ইলিয়াস আলীই হোক। এখন কারো পুলিশের লাশ দেখলে বিকৃত সুখানুভূতি। কারো তৃপ্তি নিজ বা ভিন্ন দলের কর্মীর লাশ দেখলে। কখনো কখনো কোনো কোনো তন্ত্রের কাছে সৈন্য মরলে মূল্যবান, বেঁচে থাকলে বেতনভোগী বোঝা।  রাজনৈতিক দলান্ধ পাগল শ্রেণি অনেক সময় বুঝে উঠতে পারে না জালিম আর মজলুম দুপক্ষই পরস্পরের ওপর জুলুমের দায় চাপায়। জালিম জিতে যায়। মজলুম সংখ্যায় অনেক হয়ে গেলেও থাকে লঘু হয়ে। টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরাম, পুলিশ কনস্টেবল আমিনুল আর যুবদলের বিল্লালরা এই মজলুমই। তারা রাজনীতির ফাঁস আর ফাঁদের শিকার মাত্র।
সেদিনের ভিডিও ফুটেজে দেখা গেল সবুজ শার্ট, নীল প্যান্ট, পায়ে বুট, মাথায় হেলমেট পরা একজনকে ইটের খোয়া আর ডাবের খোসার মধ্যে ফেলে পেটাচ্ছে কিছু লোক। শেষ পর্যন্ত মারা যান মানুষটি। কিছুক্ষণ পর জানাজানি হয়, ওই ব্যক্তি একজন পুলিশ কনস্টেবল। মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে আমিনুলকে পেটানোর বিভিন্ন ছবি, জীবনের গল্প ভেসে আসতে থাকে। শুভবুদ্ধির মানুষের হৃদয়ে ক্ষরণ হয়। হৃদয়ে এমন রক্তক্ষরণ হয়েছে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হককে বন্দুকযুদ্ধে হত্যার অডিও প্রকাশের পরও। সেই অডিওতে একরামুল হকের মেয়েকে বলতে শোনা যায়, ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে…’।
এখন প্রায় একই কান্না পুলিশ আমিনুলের স্বজনদের। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে পুলিশ ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত স্থানীয় ছাত্রদল নেতা রিফাত উল্লাহর স্ত্রী রাজিয়ারও প্রশ্ন, ‘আমার মেয়ের বাপ আর নাই। মেয়ের বাপরে পুলিশ মাইরা ফেলছে। আমার মেয়ে এখন কারে বাপ ডাকব? তোমরা পুলিশরে গিয়া জিগাও’—এই প্রশ্নের উত্তর রাজনীতিবিদদের দেওয়ার কথা। কিন্তু, খেলারামরা জবাব দেয় না। ঝিম মেরে মজা দেখে। আর কলকাঠি নাড়ে। এসবের ঘটক, অনুঘটক, আয়োজক কারা? সাম্প্রতিক এই সহিংসতাসহ নানা ঘটনায় আবারও প্রমাণ করল স্বাধীনতার এত বছর পর শুধু ক্ষমতার অদলবদল ঘটাতে ফাঁস আর ফাঁদের এতো আয়োজন।
খুন-গুমের শিকার পরিবারগুলোর দুঃখ-যন্ত্রণাকে যে যার মতো অবজ্ঞা করছে। কোনোটিকে আবার হৃদয়বিদারক বলছে। এ ব্যাপারে সবাই এক মহাস্বাধীনতা ভোগ করছে। সমস্যা স্বীকার না করারও এক আজব স্বাধীনতাও ভর করেছে। অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়েও এই গোয়াতুমি। রাজনীতির ব্যারাম অর্থনীতির ওপরও পড়েছে।  নিত্যপণ্যের বাজারে পাগলা ঘোড়া ছুটছে দানবের মতো। গোল আলু থেকে শুরু করে পেঁয়াজ-মরিচ-শুটকি সবখানেই সিন্ডিকেট। রপ্তানি আয় কমতে কমতে তলানিতে। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে সকল মাত্রা ছাড়িয়ে। তৈরি পোশাক শিল্প সেক্টরেও বিপর্যয়। প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স খাতে অবিরাম খরা। কোনো সূচকেই সুসংবাদ নেই।
এর মাঝে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশের চার কোটির বেশী মানুষ ইউরোপের ষ্টান্ডার্ডে বাস করে। এর আগে বাংলাদেশের মানুষ স্বর্গে আছে বলে দাবি করেছেন অর্থমন্ত্রী। তাদের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য-সাবুদ থাকতেও পারে। দেশটির বহু মানুষ যে জান্নাতি সুখ সম্ভোগে আছে তাও সঠিক। ফেঁসে যাওয়া আমজনতা এই বেহেস্তে কী দশায়  আছে তা ফুটপাত থেকে কাঁচাবাজার সব জায়গায়ই দৃশ্যমান। ক্ষমতাসীন বা বিরোধীদল কারো মধ্যেই এ বিষয়ে কোনো এজেন্ডা নেই। আছে ‘খেলা হবে-খেলা হবে’ আওয়াজ। এ খেলার অতি খেলোয়াড়রা সমানে পেনাল্টিতে মারছে মানুষকে। ঘায়েল করছে, ফাঁসাচ্ছে সরকারকেও। চাল, ডাল, তেল, নুন, চিনি, আটা, ময়দা, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, চামড়া, আমড়া সব কিছু নিয়েই খেলছে সমানে। তারা দেশের খাদ্য সঙ্কটের তাওয়ায় তা দিচ্ছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি-ডব্লিউএফপির সর্বশেষ সমীক্ষা বলছে,  বাংলাদেশে এই বছরের আগস্টে জনসংখ্যার প্রায় ২৪ শতাংশ বা ৪ কোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীন ছিল, যা এই বছরের মে মাস থেকে ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেখিয়েছে।সমীক্ষা মতে, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে ৪৭ শতাংশ মানুষ। ডব্লিউএফপির জরিপ থেকে উঠে আসা চিত্রটি এই বছরের মার্চ মাসে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং সানেম দ্বারা পরিচালিত একটি সমীক্ষার ফলাফলের কাছাকাছি। সানেম নিম্ন আয়ের পরিবারের জীবনযাত্রার অবস্থার ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব পরীক্ষা করার জন্য দেশের আটটি বিভাগের ১ হাজার ৬০০টি নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। তাদের সমীক্ষা বলছে, ৭০ শতাংশের বেশি দরিদ্র পরিবার তাদের খাদ্যের খরচ কমিয়েছে। মাংস, মাছ ও ডিমের বদলে  নিম্নমানের খাবার বেছে নিয়েছে, যা তাদের খাদ্যনিরাপত্তার পরিস্থিতি ছয় মাস আগের তুলনায় আরও খারাপ করেছে। ফেঁসে গেলে বা ফাঁদে পড়লে জন্তুদেরও যা হয়। তা এখন আশরাফুল মাখলুকাত মানুষেরও। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের মাসিক মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ২ থেকে বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হয়েছে। লুকানোর আর কোনো সুযোগ নেই এ বাস্তবতাকে। এরপরও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে দিতে সরকার ও ব্যবসায়ীরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে দুর্বল করে ফেলেছে।
ব্যাংক খাতের সংকট কাটাতে বছরজুড়েই প্রভাবশালীদের চাপে একের পর এক সিদ্ধান্ত বদল করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঠিক সময়ে পাচার থামাতে, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল ঋণ বন্ধ ও ফেরত আনতে পারেনি, দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতির সময়ে পারেনি এক অঙ্কের বেঁধে দেওয়া সুদের হার থেকে সরে আসতে। রিজার্ভ থেকে দেওয়া উন্নয়নসহায়তা ঋণ ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকগুলোতে ফাঁসানোর যতো কাণ্ডকীর্তি। ক্রমাগত বড় বড় ব্যাংকিং ঋণ কেলেঙ্কারি চলতে থাকলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেয়নি, বরং পর্যবেক্ষক সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এসবের অন্যতম উদ্দেশ্য ব্যাংক মালিক পরিচালক, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের সম্পদ হস্তান্তর, সস্তায় ঋণ সরবরাহ। এসবের পরতে পরতেও লুকিয়ে আছে নিষ্ঠুর রাজনীতি।
এর আগে রিজার্ভ থেকে উন্নয়ন প্রকল্পে ডলার ঋণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শ শোনেনি সরকার । নিজেও এক ধরনের ফেঁসে গিয়ে স্বাধীন মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মূলধন খেয়ে ফেলা, মালিকানা হস্তান্তর, বাড়ন্ত খেলাপি ঋণ ও ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে পারেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ডলার রেট নির্ধারণেও স্বাধীন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায়নি। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরাই নীতি নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা নিয়ে ফাঁদে ফেলেছে সরকারকে। আসলে ফাঁদ আর ফাঁস এখন একদিকে নয়, সবদিকেই। আমজনতাকে প্যাঁচিয়ে ফাঁসটিকে আরো সর্বব্যাপী করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে জাতীয় রূপ। কিন্তু, ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারকারী, করখেলাপি লুটেরারা থেকে যাচ্ছে ফাঁকতালে। ফলে দিনে দিনে দেশ-জনতা ক্ষমতাকে ঘিরে এক ভীতির রাজনীতির ফাঁদে আটকে যাচ্ছি।

লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category