• মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ০৪:৫২ অপরাহ্ন
Headline
স্কুল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ: পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার সংকট চালু হচ্ছে ‘ই-ঋণ’ সেবা: ব্যাংকে না গিয়ে ঘরে বসেই মিলবে ৫০ হাজার টাকা লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত, ঢাকার তীব্র নিন্দা দেশে হাম ও উপসর্গে আরও ৯ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১১৯২ ‘মুসলিমদের অত্যাচার করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না’: মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয় জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক, তবে তা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে: বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সিএনএনের বিশ্লেষণ: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ থেকে সামরিক দীক্ষা নিচ্ছে চীন, সতর্ক পর্যবেক্ষণে তাইওয়ান ইস্যু বিশ্বকাপ বয়কট ছিল আত্মঘাতী, ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্দশায় খেলোয়াড়রা রিকশা চালাচ্ছিল’: ভারতীয় গণমাধ্যমে অকপট তামিম সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিনের হাহাকার: কুকুরের কামড়ে ৭২ ঘণ্টায় ৩ জনের মৃত্যু পশুবাহী যানবাহনে চাঁদাবাজি রোধে পুলিশের হটলাইন, অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রাজস্ব আদায়ের নতুন কৌশল: আগামী বাজেটে করজালে আটকা পড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও মোটরসাইকেল

Reporter Name / ২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে যারা করজালের বাইরে ছিলেন বা যেসব অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে সরকারের কোনো আয় আসছিল না, এবার সেগুলোর দিকে নজর দিয়েছে সংস্থাটি। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এক অভিনব ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে এনবিআর। প্রাইভেটকার, জিপ কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো এবার দেশের আনাচে-কানাচে দাপিয়ে বেড়ানো ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান বাহন মোটরসাইকেলের ওপরও অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে। দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই দুটি খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা দেখছে সরকার। এর মাধ্যমে করজালের পরিধি যেমন বাড়বে, তেমনি এতদিন ধরে যারা নিয়মিত কর দিয়ে আসছিলেন, তাদের ওপর থেকে রাজস্বের একক চাপ কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বর্তমানে ঠিক কতসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা সরকারি পরিসংখ্যান কারও কাছে নেই। এর মূল কারণ হলো, এতদিন এসব যানের নিবন্ধনের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা বা সুনির্দিষ্ট কাঠামো ছিল না। তবে পরিবহণ খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে ৫০ লাখেরও বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইক চলাচল করছে। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই এই সংখ্যা দশ থেকে বারো লাখের কাছাকাছি। কোনো ধরনের নিবন্ধন বা কর প্রদান ছাড়াই এই বিপুলসংখ্যক থ্রি-হুইলার বছরের পর বছর ধরে রাস্তা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এতে সরকার যেমন হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি সড়কে তৈরি হচ্ছে চরম বিশৃঙ্খলা। এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে এবং খাতটিকে একটি নিয়মের মধ্যে আনতে গত বছর ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’-এর একটি খসড়া প্রণয়ন করেছিল সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগ। এই নীতিমালার আলোকেই এবার কর আরোপের পথ সুগম করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত নতুন নিয়মে এলাকাভেদে ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর ভিন্ন ভিন্ন হারে কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। জানা গেছে, কোনো ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন যদি সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে হয়, তবে এর মালিককে বছরে ৫ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হবে। যানটি যদি পৌরসভা এলাকার জন্য নিবন্ধিত হয়, তবে করের পরিমাণ হবে দুই হাজার টাকা। আর ইউনিয়ন পর্যায়ের ক্ষেত্রে প্রতিবছর এক হাজার টাকা কর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। লাইসেন্স প্রদান বা তা নবায়নের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই কর আদায় করবে। এই পুরো প্রক্রিয়াকে আইনি বৈধতা দিতে গত ২৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯’ সংশোধন করা হয়। এই সংশোধনের ফলে সিটি করপোরেশনগুলো তাদের নিজ নিজ এলাকায় ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলারের নিবন্ধন ও অনুমোদনের আইনি ক্ষমতা পেয়েছে। খসড়া নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি নিজের নামে মধ্যম গতির তিনটির বেশি এবং কোনো কোম্পানির নামে ২৫টির বেশি অটোরিকশা নিবন্ধন করতে পারবেন না। ধীরগতির অটোরিকশার ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি কিনতে ও নিবন্ধন করতে পারবেন। এছাড়া অনুমোদিত ডিলাররা নিবন্ধনের যাবতীয় কাজ শেষ না করে কোনো যান ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন না।

ব্যাটারিচালিত রিকশার পাশাপাশি আগামী বাজেটের আরেকটি বড় চমক হতে যাচ্ছে মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপ। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৮০টি। এতদিন মোটরসাইকেল চালকদের কোনো অগ্রিম আয়কর দিতে হতো না। তারা শুধু বাহন কেনার সময় এককালীন নিবন্ধন ফি এবং দুই বছর পরপর নির্দিষ্ট হারে রোড ট্যাক্স বা সড়ক কর পরিশোধ করতেন। বিদ্যমান নিয়মে ৫০ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত ক্ষমতার মোটরসাইকেলের সর্বমোট রেজিস্ট্রেশন ফি ৯ হাজার ২৯১ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি দুই বছর পরপর চার কিস্তিতে ৪ হাজার ৬০০ টাকা রোড ট্যাক্স দিতে হয়। ১২৫ সিসির বেশি ক্ষমতার ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি ১১ হাজার ৭৬৪ টাকা এবং রোড ট্যাক্স ৯ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিসি বা ইঞ্জিন ক্ষমতাভেদে মোটরসাইকেলের ওপর দুই হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রান্তিক বা সাধারণ ব্যবহারকারীদের কথা মাথায় রেখে ১১০ সিসি পর্যন্ত ক্ষমতার মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রিম আয়কর দিতে হবে না। এটি মূলত নিম্ন আয়ের মানুষের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করবে। তবে ১১১ সিসি থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত ক্ষমতার মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে মালিককে বছরে দুই হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর গুনতে হবে। ইঞ্জিন ক্ষমতা যদি ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির মধ্যে হয়, তবে এই করের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে পাঁচ হাজার টাকায়। আর ১৬৫ সিসির চেয়ে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন বিলাসবহুল বা উচ্চগতির মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে প্রতিবছর ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর দেওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে। বর্তমান আয়কর আইন অনুযায়ী, গাড়ির মালিকদের প্রতিবছর ফিটনেস নবায়নের সময় নির্দিষ্ট হারে এই অগ্রিম আয়কর দিতে হয়, যা বার্ষিক আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় মূল করের সঙ্গে সমন্বয় করার আইনি সুযোগ থাকে। একইভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং মোটরসাইকেলের মালিকরাও বছর শেষে তাদের আয়কর রিটার্নের সঙ্গে এই অগ্রিম কর সমন্বয় করতে পারবেন, যা দেশে রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা বাড়াতেও পরোক্ষভাবে দারুণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, জিপ এবং বাস-ট্রাকের মতো বড় যানবাহনের ওপর আগে থেকেই অগ্রিম আয়কর আরোপিত রয়েছে। যেমন, একটি সিএনজি অটোরিকশাকে বছরে আড়াই হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। প্রাইভেটকার ও জিপ গাড়ির ক্ষেত্রে ইঞ্জিনের সিসিভেদে এই আয়করের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। অন্যদিকে, যাত্রীবাহী বাসের ক্ষেত্রে ৫২ সিটের বেশি আসনের বাসের অগ্রিম আয়কর ২৫ হাজার টাকা এবং এর কম আসনের বাসের জন্য ২০ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ক্ষেত্রে এই কর ৫০ হাজার টাকা, দোতলা বাস ও এসি মিনিবাসের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা এবং নন-এসি মিনিবাস বা কোস্টারের ক্ষেত্রে সাড়ে ১২ হাজার টাকা। এবার এই দীর্ঘ তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে সাধারণের বাহন মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা।

এনবিআরের এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাদিউজ্জামান এই উদ্যোগের কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্কও করেছেন। তার মতে, সড়ক পরিবহণ আইনে মোটরসাইকেল একটি সম্পূর্ণ বৈধ বাহন। বর্তমানে এই বাহনটি শুধু ব্যক্তিগত কাজেই নয়, বরং রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। তাই ব্যক্তিগত গাড়ি বা অন্যান্য বাণিজ্যিক যানবাহনের মতো মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপ করা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিধি এবং করজালের কলেবর উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি যারা এতদিন ধরে নিয়মিত কর দিয়ে আসছিলেন, আনুপাতিক হারে তাদের ওপর থেকে করের বোঝা কিছুটা হলেও কমবে। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর কর আরোপের বিষয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও কৌশলী ও দূরদর্শী হওয়া উচিত। কারণ, ইতিমধ্যেই রাজধানীর সড়কগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি এই স্বল্পগতির বাহন চলাচল করছে।

অধ্যাপক হাদিউজ্জামানের সতর্কবার্তার মূল কারণ হলো, এসব আনফিট ও স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর কারণে প্রতিনিয়ত সড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত যানজট এবং ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। কর আরোপের ফলে এসব যানের মালিকরা এক ধরনের পরোক্ষ আইনি বৈধতা পেয়ে যাবেন, যা তাদের প্রধান সড়কে চলাচলে আরও বেপরোয়া করে তুলতে পারে। এর ফলে যানজট ও দুর্ঘটনার কারণে রাষ্ট্রের যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হবে, তা হয়তো অগ্রিম আয়কর থেকে সরকারের প্রাপ্ত রাজস্বের চেয়ে বহুগুণ বেশি হবে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, কেবল রাজস্ব আদায়ের অন্ধ মোহ থেকে নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সার্বিক স্বার্থে এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। অগ্রিম আয়কর আরোপের আগে অটোরিকশার সংখ্যা নির্দিষ্ট করা, সড়কের ধারণক্ষমতা যাচাই করা এবং মূল সড়কে এদের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, রাজস্ব আদায়ের এই নতুন উদ্যোগ দিন শেষে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category