নির্মাণকাজের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো এবং নানা জটিলতার পর অবশেষে উৎপাদনে আসার চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি বাজেটে নির্মিত এই মেগা প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতীক্ষা চলছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে ‘ফুয়েল লোডিং’ বা পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমেই মূলত পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, চলতি মাসের শেষেই প্রথম ইউনিটের এই ফুয়েল লোডিং কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে এবং বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল স্থাপনায় তড়িঘড়ি করে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফুয়েল লোডিংয়ের পর দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পাইলট অপারেশন সম্পন্ন করতে হবে, যার ফলে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসতে আরও বেশ খানিকটা সময় লাগতে পারে।
পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি গোটা বিশ্বেই অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত একটি কার্যক্রম। এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণ এবং চালুর ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অসংখ্য নিরাপত্তামূলক স্তর অতিক্রম করতে হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ক্ষেত্রে ‘ফুয়েল লোডিং’ কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়াকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর একেবারে চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ফুয়েল লোডিং হলো রিঅ্যাক্টর বা পারমাণবিক চুল্লির মূল অংশে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সুরক্ষিতভাবে প্রবেশ করানো বা স্থাপন করার প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে চুল্লিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের রাসায়নিক ও ভৌত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। এটি কোনো সাধারণ সুইচ টেপার মতো কাজ নয়, বরং একটি অত্যন্ত ধীর, সুনির্দিষ্ট এবং সতর্কতামূলক প্রক্রিয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র এই ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতেই প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ (Nuclear Fission) বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। পারমাণবিক চুল্লিতে স্থাপিত ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে সেখানে প্রচুর পরিমাণে তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এই প্রচণ্ড তাপশক্তি ব্যবহার করে পানিকে অত্যন্ত উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করা হয়। পরবর্তীতে সেই উচ্চচাপের বাষ্প দিয়ে বিশাল টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি স্বয়ংক্রিয়, নিয়ন্ত্রিত এবং চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে চলতে থাকে।
সরকার চলতি বছরের ডিসেম্বরেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও, পারমাণবিক প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুয়েল লোডিং শেষ হওয়ার পরপরই পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা সম্ভব নয়। পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর পর নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে পুরোদমে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে অন্তত ছয় থেকে বারো মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর শুরু হয় ‘পাইলট অপারেশন’ বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। এই পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে পুরো সিস্টেমের কর্মক্ষমতা ও নিরাপত্তা যাচাই করা হয়। পাইলট অপারেশনের সময় যে বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়:
টারবাইন জেনারেটর সঠিকভাবে কাজ করছে কি না।
উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সাথে ঠিকমতো ‘সিনক্রোনাইজ’ বা সমন্বয় হচ্ছে কি না।
যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে ইমার্জেন্সি সাপোর্ট সিস্টেম বা স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয় হচ্ছে কি না।
এই পাইলট অপারেশনের সময় কিছু কিছু করে বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। ৫ শতাংশ বা ১০ শতাংশ হারে প্ল্যান্টের ক্ষমতা ব্যবহার করে যখন পরীক্ষা চালানো হয়, তখন পারমাণবিক জ্বালানি পুড়তে থাকে এবং সেই সময়ে ১০০, ২০০ বা ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। তবে এই পরীক্ষামূলক পর্যায়ে প্রয়োজনবোধে প্ল্যান্টটি একাধিকবার বন্ধ বা চালু করা হতে পারে।
সব ধরনের কারিগরি ও নিরাপত্তা পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর ‘ফাইনাল সেফটি অ্যানালিসিস রিপোর্ট’ বা চূড়ান্ত নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই রিপোর্টটি পুনরায় পর্যালোচনা করার পর চূড়ান্তভাবে ‘কমার্শিয়াল অপারেশনাল ডেট’ (COD) বা বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ ঘোষণা করে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সক্ষমতা। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থামানো বা চালু করা হলেও, একবার চূড়ান্ত বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়ে গেলে এটি আর সহজে থামানো হয় না।
পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক অপারেশন শুরুর পর রিঅ্যাক্টরটি তার মোট ক্ষমতার ৯০ শতাংশ ক্যাপাসিটিতে পুরোদমে একটানা চলতে শুরু করবে। এভাবে টানা ১৮ মাস বা দেড় বছরের একটি সাইকেলে রিঅ্যাক্টরটি নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যাবে। দেড় বছর পার হওয়ার পর ‘ফুয়েল রিপ্লেসমেন্ট’ বা ব্যবহৃত জ্বালানি পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য এটি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হবে। রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ হলে পুনরায় নতুন করে ১৮ মাসের সাইকেল শুরু হবে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো এর নিরাপত্তা। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে এই ধরনের প্রকল্পের সাফল্য যেমন বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করে, তেমনি এর সামান্য ত্রুটি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনোভাবেই আপস করার সুযোগ নেই বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিরাপদ রাখতে প্রধানত যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া হয়:
অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা: প্ল্যান্টের ভেতরে যেকোনো ধরনের অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণের সর্বাধুনিক ব্যবস্থা।
জরুরি সাপোর্ট সিস্টেম: যেকোনো যান্ত্রিক ত্রুটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুল্লি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কুলিং সিস্টেম চালু হওয়ার ব্যবস্থা।
ইভাকুয়েশন প্ল্যান: অনাকাঙ্ক্ষিত বা বিপজ্জনক কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্ল্যান্টের কর্মী এবং আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষকে দ্রুত ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পূর্বনির্ধারিত ও কার্যকর পরিকল্পনা।
পরমাণু শক্তি কমিশন জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সব কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে বিভিন্ন ধাপের পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা সম্পন্ন হওয়ার পরই এই লাইসেন্স মিলেছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিসহ মূল অবকাঠামোর নির্মাণকাজ বেশ আগেই শেষ হয়েছিল এবং রাশিয়ার কাছ থেকে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালানও নিরাপদে দেশে এসে পৌঁছেছিল। কিন্তু তারপরেও উৎপাদনে বিলম্ব হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বা গ্রিড সক্ষমতা তৈরি না হওয়া। এত বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য যে বিশেষ সঞ্চালন লাইন প্রয়োজন, তার কাজ শেষ হতে সময় লাগছিল।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রিড লাইন এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। প্রথম ইউনিটের জন্য চারটি সঞ্চালন লাইন সফলভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রস্তুত থাকা লাইনগুলো হলো:
রূপপুর থেকে বাঘাবাড়ি পর্যন্ত দুটি সার্কিট লাইন।
রূপপুর থেকে বগুড়া পর্যন্ত একটি সার্কিট লাইন।
রূপপুর থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত একটি সার্কিট লাইন।
এই সার্কিটগুলোর প্রত্যেকটির পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য গ্রিডের সক্ষমতা তৈরির কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে এবং তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদনে আসার অনেক আগেই মোট আটটি সঞ্চালন লাইন পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের এই সময়ে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি বিশাল মাইলফলক হতে পারে। সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা, নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং সঞ্চালন লাইনের সমন্বয় সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে, এই মেগা প্রকল্প দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে আশা করা যায়। তবে মানুষের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখাই হবে কর্তৃপক্ষের জন্য আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।