• মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৬ অপরাহ্ন
Headline
মাদক ও সাইবার অপরাধ রুখতে কড়া হুঁশিয়ারি আইজিপির কলেজছাত্র হত্যায় ৭ জনের ফাঁসি স্বস্তিতে শুরু মাধ্যমিকের লড়াই: প্রশ্নফাঁসের শঙ্কা উড়িয়ে দিলেন শিক্ষামন্ত্রী বাসের ভাড়ায় আসছে সমন্বয়, সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে ‘আঞ্চলিক’ নববর্ষের রূপরেখা ত্যাগের মূল্যায়নে স্বজন-ছায়া: নারী আসনে বিএনপির ৩৬ মুখ জোটের শরিকদের ছাড়, নারী আসনে জামায়াত-এনসিপির চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত গম পাচার কেলেঙ্কারি: ভোটের মুখেই ইডির তলবে বিপাকে নুসরাত ব্যাট ছেড়ে মালিকানায় ‘ইউনিভার্স বস’: স্কটিশ ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনলেন গেইল জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—সরকারের সাশ্রয়ের বিপরীতে কতটা পুড়ছে সাধারণ মানুষ? চার দেওয়াল পেরিয়ে দেশ গড়ার অঙ্গীকার: নারী আসনের ভোটে সরগরম নির্বাচন ভবন

রেকর্ড ৯.৩০ লাখ কোটির বাজেট আসছে: ঘাটতি মেটানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা / ১৮ Time View
Update : রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধাবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির নানামুখী চাপের মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এক বিশাল ও উচ্চাভিলাষী বাজেটের রূপরেখা চূড়ান্ত করছে নতুন নির্বাচিত সরকার। গত অর্থবছরগুলোর তুলনায় এবারের বাজেটের আকার প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার রাতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই মহাপরিকল্পনার খসড়া তৈরি করা হয়।

বাজেট সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নবনির্বাচিত সরকারের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা। একদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ, অন্যদিকে ডলার সংকট ও মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা—এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে সরকার একটি ‘প্রসারণমূলক’ বাজেটের দিকেই এগোচ্ছে।

বাজেটের বিশালত্ব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থনীতির চাকা কিছুটা ধীরগতির ছিল, যার ফলে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার কমিয়ে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর উন্নয়নের পালে হাওয়া দিতে বাজেটের আকার এক লাফে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর সাহস দেখিয়েছে। অতীতে সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়লেও এবার ১৮ শতাংশের এই উল্লম্ফন প্রমাণ করে যে, সরকার বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার ও বিনিয়োগের পথে হাঁটছে।

কেন এই বিশাল ব্যয়? প্রধান ৫টি কারণ

বাজেটের এই স্ফীতি কেবল ইচ্ছাধীন নয়, বরং কিছু বাস্তবমুখী প্রয়োজনের প্রতিফলন। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা ব্যয়ের পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন:

  • ভর্তুকির পাহাড়: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম আকাশচুম্বী। বিশেষ করে মার্চ-জুন সময়েই অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আগামী অর্থবছর এই চাপ আরও বাড়বে।

  • নতুন বেতন কাঠামো: দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেলের সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

  • সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের জন্য বিশেষ ‘কৃষক কার্ড’ চালুর জন্য বড় অংকের বরাদ্দ প্রয়োজন।

  • সুদ পরিশোধের দায়: বিগত বছরের ঋণগুলোর কিস্তি ও সুদ পরিশোধে বাজেটের একটি বড় অংশ খরচ হয়ে যাচ্ছে।

  • নির্বাচনী গ্যারান্টি: ‘নতুন কুঁড়ি’ ক্রীড়া বৃত্তি এবং বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্পগুলোতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বাড়তি বরাদ্দ থাকছে।

রাজস্ব আহরণ ও বিশাল ঘাটতির চ্যালেঞ্জ

বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর অর্থায়ন। ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে সরকার মাত্র ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার চেষ্টা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে।

এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার দুটি পথ বেছে নিয়েছে:

১. অভ্যন্তরীণ ঋণ (১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা): ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার এই বিপুল টাকা ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে বাধা হতে পারে।

২. বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা (১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা): আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো থেকে ‘বাজেট সাপোর্ট’ পাওয়ার আশায় রয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রীর ওয়াশিংটন সফর এই ঋণের পথ প্রশস্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লক্ষ্যমাত্রা: উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লাগাম

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের প্রধান দুশ্চিন্তা ‘মূল্যস্ফীতি’ নিয়ে। সরকার এটি ৭.২ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করলেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

উন্নয়ন বনাম পরিচালন ব্যয়: অগ্রাধিকার কোথায়?

বাজেটের ব্যয়ের কাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় ৬৭ শতাংশই চলে যাচ্ছে পরিচালন বা অনুন্নয়ন খাতে (বেতন, ভাতা, সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকি)। বাকি ৩৩ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য। যদিও নতুন উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার ঘোষণা রয়েছে, তবে এখনই মেগা প্রকল্পে বড় অর্থ ব্যয়ের চেয়ে বন্ধ কারখানা সচল করা এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচ (Ease of Doing Business) কমানোর দিকেই সরকারের ঝোঁক বেশি।

১ ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন ও ২০৩৪ সালের লক্ষ্য

বাজেট মনিটরিং কমিটির আলোচনায় উঠে এসেছে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের রূপরেখা। এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভ্যাট অব্যাহতি কমিয়ে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা

সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁরা একটি ‘ক্ষতবিক্ষত’ অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। বিগত এক দশকের অব্যবস্থাপনা এবং অর্থ পাচারের ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলা করেই এই বাজেট সাজানো হচ্ছে। জনগণের বিপুল প্রত্যাশা এবং অতীতের সীমাবদ্ধতা—এই দুয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই আগামী বাজেটের মূল দর্শন।

বৈশ্বিক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা

পুরো বাজেট পরিকল্পনাই দাঁড়িয়ে আছে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা যদি সরাসরি যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তেল ও সারের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সেক্ষেত্রে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট সংশোধন করে আরও বাড়াতে হতে পারে অথবা উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ কাটছাঁট করতে হতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এই বাজেট কেবল একটি সংখ্যাতত্ত্বের দলিল নয়, বরং নবনির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার প্রতিফলন। সাধারণ মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থানের যে বিশাল স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। উচ্চাভিলাষী এই বাজেট যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু প্রশাসনিক অদক্ষতা ও বৈশ্বিক সংকট তিব্রতর হলে এই বিশাল ঘাটতিই অর্থনীতির জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category