দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আজ এক চরম কাঠামোগত সংকটে নিমজ্জিত| রোগ নির্ণয়ের অতি জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো মাসের পর মাস অচল হয়ে পড়ে থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেগুলোর সামান্য ত্রুটিটুকুও সারিয়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না| সামান্য একটি ইঁদুরে তার কেটে দেওয়ার মতো তুচ্ছ কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুটি সিটি স্ক্যান মেশিনের একটি টানা চার মাস ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আছে| অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, এই তারটি প্রতিস্থাপন করতে মাত্র ২০ হাজার টাকার মতো সামান্য অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন| কিন্তু একটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি হাসপাতালের পরিচালকেরও সেই একক প্রশাসনিক বা আর্থিক ক্ষমতা নেই যে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এই সামান্য অর্থ খরচ করে যন্ত্রটি সচল করবেন| রেডিওলজি বিভাগ থেকে ফাইল যায় হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তরে, সেখান থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এবং পরিশেষে ফাইল পাঠানো হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে| এই দীর্ঘ প্রশাসনিক টেবিল বদলের জটিল প্রক্রিয়ায় ফাইল চালাচালি কবে শেষ হবে এবং সেবা কবে চালু হবে, তার কোনো সদুত্তর কারও কাছে নেই| ফলে সামান্য যন্ত্রাংশের অভাবে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি দেশের দরিদ্র রোগীরা সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন|
যন্ত্রপাতি সরবরাহের জটিল শর্ত এবং ঠিকাদারি চুক্তির ত্রুটি এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে| ঢাকা মেডিকেলের রেডিওলজি বিভাগের প্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরবরাহকারী বা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি কোনো চুক্তি বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ থাকে না| পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত হয় কেন্দ্রীয়ভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে| ফলে কোনো যন্ত্র বিকল হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরাসরি কোম্পানিকে কোনো কাজের নির্দেশ দিতে পারে না| আবার নিজেদের উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে কোনো প্রকৌশলী ডেকে মেরামত করতে গেলে সরবরাহকারী কোম্পানির ওয়ারেন্টি বাতিল হওয়ার আইনি ঝুঁকি তৈরি হয়| পরবর্তীকালে বড় কোনো ক্ষতি হলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আর কোনো দায়িত্ব নেবে না—এমন প্রশাসনিক ভয়ের কারণে কোনো কর্মকর্তাই ঝুঁকি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পান না| এই প্রশাসনিক অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিক্রয়োত্তর সেবা দিতেও চরম অনীহা দেখায়| কারণ, তারা হাসপাতাল থেকে সরাসরি কোনো বিল পায় না| ফলে অনেক সময় সামান্য ত্রুটি নিয়ে একটি নষ্ট মেশিন দুই থেকে চার বছর এভাবে অযত্নে পড়ে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তা একেবারেই ব্যবহারের অযোগ্য ও পরিত্যাজ্য হয়ে যায়|
এই হতাশাজনক চিত্রটি শুধু ঢাকা মেডিকেলের একক কোনো ঘটনা নয়, বরং সারা দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক সার্বিক ও করুণ প্রতিচ্ছবি| বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার বা পিপিআরসির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের মেডিকেল কলেজ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রায় ৫২ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসরঞ্জাম গত এক বছর ধরে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে আছে| দেশের সবচেয়ে বড় রেফারাল হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেলেই ১০টি এক্স-রে যন্ত্রের মধ্যে ৪টি সম্পূর্ণ নষ্ট| দুটি এমআরআই মেশিনের একটি এবং ১০টি আল্ট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্রের ৩টি দীর্ঘদিন ধরে অচল| একটি সরকারি যন্ত্রে যেখানে দিনে গড়ে ২৫টি পরীক্ষা করার বৈজ্ঞানিক নিয়ম রয়েছে, সেখানে অন্যগুলো বিকল থাকায় সচল যন্ত্রটির ওপর দৈনিক কয়েক গুণ বেশি চাপ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে| এর স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে অতিরিক্ত লোড নিতে না পেরে ভালো যন্ত্রপাতিগুলোও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে| একই চিত্র রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালেও| সেখানে একটি এমআরআই মেশিন টানা চার বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে| ৯৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকলেও, তাদের প্রয়োজনীয় ১৬৮টি পরীক্ষার মধ্যে ৫৫টি পরীক্ষাই সেখানে বছরের পর বছর ধরে বন্ধ রয়েছে|
হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম অচল থাকার পাশাপাশি জীবনরক্ষাকারী ডায়াগনস্টিক কিটের তীব্র অভাব বিরাজ করছে| সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভিটামিন ডি পরীক্ষার কিট দীর্ঘদিন ধরে শেষ হয়ে আছে| পাঁচটি এক্স-রে মেশিনের দুটি অচল থাকায় রোগীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সেবা পাচ্ছেন না| ঢাকা মেডিকেল কলেজের হৃদরোগীদের জীবনরক্ষার একমাত্র ভরসা ক্যাথ ল্যাবটি টানা তিন মাস ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যার কারণে হার্টের জটিল রোগীদের এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি কিংবা স্টেন্ট বা রিং পরানোর মতো অতি জরুরি চিকিৎসাসেবা থমকে গেছে| জাতীয় বাতজ্বর ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে ৪৫টি সাধারণ পরীক্ষার মধ্যে ইউরিন আরএমই, ইউরিন কালচার, থ্রোট সোয়াব কালচার ও ইসিজির মতো প্রাথমিক ও অপরিহার্য পরীক্ষাগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে| অন্যদিকে জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটের হেল্প ডেস্কে কোন কোন পরীক্ষা চালু আছে, তার কোনো তালিকা পর্যন্ত টাঙানো নেই| তালিকাটি নামিয়ে রাখা হয়েছে এবং তা কবে আবার টানানো হবে, সে বিষয়ে দায়িত্বরত কর্মচারীরা কিছুই বলতে পারছেন না|
যন্ত্রপাতির এই তীব্র সংকট সরাসরি রোগীদের ঠেলে দিচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভয়াবহ আর্থিক শোষণের মুখে| প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের বারান্দা ও ওয়ার্ডে এখন প্রকাশ্যেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে বেসরকারি ক্লিনিকের দালাল চক্র| যে সাধারণ পরীক্ষাটি সরকারি হাসপাতালে মাত্র এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় করানো সম্ভব, যন্ত্র নষ্ট থাকার অজুহাতে রোগীকে বাধ্য হয়ে বাইরের বাণিজ্যিক সেন্টারে তা সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ১১ হাজার টাকা খরচ করে করাতে হচ্ছে| সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে দুই হাজার টাকার এমআরআই পরীক্ষা করাতে না পেরে বাইরে রোগীদের গুনতে হচ্ছে সাত থেকে নয় হাজার টাকা| দুই হাজার টাকার ভিটামিন ডি টেস্ট কিটের অভাবে বাইরে চার হাজার টাকায় করতে হচ্ছে| এমনকি সরকারি হাসপাতালে ওষুধসহ যে এনজিওগ্রাম মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকায় করা যেত, সেই একই সেবার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের কাছ থেকে ১৮ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত একপ্রকার জিম্মি করে আদায় করা হচ্ছে| ফলে সরকারি হাসপাতালে একটি মেশিন একদিন বন্ধ থাকা মানে শুধু সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়া নয়, বরং হাজার হাজার অসহায় পরিবারের পকেট কেটে বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া|
যন্ত্রপাতির সংকটের সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হাসপাতালগুলোতে দক্ষ জনবল ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ভয়াবহ শূন্যতা| বর্তমানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের মোট অনুমোদিত পদ রয়েছে ৬ হাজার ৪০৬টি| এর মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৩ হাজার ৮৯২ জন, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদই বছরের পর বছর ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে| বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে এই শূন্য পদের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৭ শতাংশ এবং জেলা হাসপাতালগুলোতে ১২ শতাংশ| এই তীব্র জনবল সংকটের কারণে দেশের বহু সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক রেডিওলজি ও ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম কেনা হলেও, তা পরিচালনা করার মতো দক্ষ লোকবলের অভাবে যন্ত্রগুলো প্যাকেটবন্দি অবস্থাতেই নষ্ট হচ্ছে|
এই পুরো আমলাতান্ত্রিক জট ও চিকিৎসাব্যবস্থার পঙ্গুত্বকে ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক মানসিকতার চরম কুফল হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা| তাদের মতে, প্রশাসনিক কাঠামোতে এখনো সেই পুরোনো যুগের মতো অধস্তনদের ওপর অনাস্থা রাখা এবং সমস্ত সিদ্ধান্ত ও আর্থিক ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা বিদ্যমান| এই কেন্দ্রিকতার কারণেই মাঠপর্যায়ের হাসপাতালগুলো কোনো স্বাধীন আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না| বিশ হাজার টাকার একটি তার বদলানোর ফাইল যখন সচিবালয়ের একাধিক টেবিলে মাসের পর মাস আটকে থাকে, তখন তা আর নিছক প্রশাসনিক বিলম্ব থাকে না, বরং তা সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকারের ওপর চরম আঘাত হিসেবে গণ্য হয়| পিপিআরসির বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, সমস্যাটি কেবল সরকারি স্বাস্থ্য বাজেটের স্বল্পতার নয়, বরং মূল সমস্যা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার পেশাদারিত্বের অভাব এবং অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের চরম অনুপস্থিতি|
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা| কিন্তু বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীদের সেবা দেওয়ার বদলে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ফাঁদে আটকে তাদের নিঃস্ব করে ফেলছে| এই ভয়াবহ দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে কেন্দ্রভিত্তিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য অবিলম্বে ভেঙে ফেলতে হবে| প্রতিটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালকে তাদের নিজস্ব ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি স্থানীয়ভাবে তাৎক্ষণিক মেরামত ও জরুরি কিট ক্রয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে| একই সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রয়োত্তর সেবাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং শূন্য পদগুলোতে দ্রুত দক্ষ টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিতে হবে| অন্যথায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারের শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক হাসপাতাল গড়ে উঠলেও, সাধারণ মানুষের রোগমুক্তির স্বপ্ন অচল যন্ত্রপাতির ধ্বংসস্তূপের নিচেই চিরতরে চাপা পড়ে থাকবে|
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ