আজকের এই বিশেষ দিনেই পৃথিবীর আলোয় জন্ম নিয়েছিলেন হলিউডের চিরন্তন রূপালী পর্দার মহাদূতি এবং বিংশ শতাব্দীর সমকালীন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী পপ আইকন মেরিলিন মনরো। ১৯২৬ সালের ১লা জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি জেনারেল হাসপাতালে অত্যন্ত সাদামাটা পরিবেশে তাঁর জন্ম হয়। জন্মের সময় সাধারণ এক পরিবারে এই দেবীর নাম রাখা হয়েছিল নরমা জিয়ান মর্টেনসন। তবে পরবর্তীতে তিনি নিজের মেধা, পরিশ্রম এবং রূপের জাদুতে মেরিলিন মনরো নামেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসে তিনি নিজের নাম চিরদিনের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখে গেছেন এবং হলিউডের অন্যতম সেরা অভিনেত্রী হিসেবে আজীবন অমর হয়ে আছেন।
মেরিলিন মনরোর শৈশব ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক, বেদনাদায়ক এবং নানাবিধ পারিবারিক প্রতিকূলতায় ভরা। তাঁর মা গ্ল্যাডিস পার্ল বেকার তীব্র মানসিক অসুস্থতার কারণে নিজের একমাত্র মেয়ের সঠিক যত্ন ও লালন-পালন করতে পারতেন না। ফলে ছোট্ট মনরোর শৈশবের বেশিরভাগ সময় কেটেছে বিভিন্ন অপরিচিত পালক পরিবারে এবং অবহেলিত সরকারি এতিমখানায়। এই নিঃসঙ্গ, ক্ষমতাহীন, ভালোবাসাীন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর শৈশবই পরবর্তীতে তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ও ব্যক্তিগত মানসিক জীবনে এক গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি জেমস ডগার্টি নামক এক সাধারণ প্রতিবেশীকে বিয়ে করেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের লুকানো অভিনয় ও মডেলিংয়ের স্বপ্ন ও গভীর আকাঙ্ক্ষার কারণে সেই প্রথম সংসার বেশিদিন টেকেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ডামাডোলের সময় একটি ড্রোন ও যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করার কারখানায় সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করার সময় ঘটনাক্রমে এক সামরিক আলোকচিত্রীর তীক্ষ্ণ নজরে আসেন তিনি। সেখান থেকেই মূলত তাঁর জীবনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায় এবং পেশাদার মডেলিং ক্যারিয়ারের চমৎকার সূচনা হয়।
মডেলিংয়ের গ্ল্যামার জগত থেকে ধীরে ধীরে নিজের প্রতিভার জোরে তিনি হলিউডের মূল ধারার চলচ্চিত্রে পা রাখেন। ১৯৫০-এর দশকে ‘জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডস’, ‘দ্য সেভেন ইয়ার ইচ’, এবং ‘সাম লাইক ইট হট’-এর মতো কালজয়ী ও ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি বিশ্বজুড়ে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও দুর্দান্ত বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেন। তাঁর অনবদ্য অভিনয়শৈলী, অনন্য শারীরিক রূপ এবং মনকাড়া আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব তাঁকে হলিউডের শীর্ষতম তারকা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। তিনি কেবল একজন সাধারণ অভিনেত্রীই ছিলেন না, বরং সমকালীন ফ্যাশন, আধুনিক রূপচর্চা ও বিশ্ব পপ সংস্কৃতির এক অবিসংবাদিত প্রতীক বা মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিলেন।
তবে রূপালী পর্দার এই জমকালো আলোর পেছনে ব্যক্তিগত জীবনে মনরো ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত একজন মানুষ। বিভিন্ন মুখরোচক জল্পনা-কল্পনা, একাধিক হাই-প্রোফাইল বিয়ে এবং বারবার বিচ্ছেদের কারণে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সবসময় সংবাদমাধ্যমের তীক্ষ্ণ নজরদারির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত। বিপুল বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা, কোটি ভক্তের ভালোবাসা এবং অগাধ বৈভবের মাঝেও তিনি এক ধরনের তীব্র মানসিক একাকীত্ব ও বিষণ্ণতায় ভুগতেন। অবশেষে ১৯৬২ সালের ৪ঠা আগস্ট মাত্র ৩৬ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসে এই মহানায়িকার অত্যন্ত রহস্যময় ও মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, যা আজ অবধি ইতিহাসের এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।
আজ ২০২৬ সালের ১লা জুন তাঁর শততম জন্মবার্ষিকীতে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি চলচ্চিত্র প্রেমী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্তরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে। শত বছর পেরিয়ে গেলেও গ্ল্যামার, ফ্যাশন এবং জাদুকরী অভিনয়ের দুনিয়ায় মেরিলিন মনরো আজও এক অমীমাংসিত রোমাঞ্চকর রহস্য এবং নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনন্ত প্রেরণার উৎস হিসেবে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো টিকে আছেন।