আমেরিকা এমন এক দেশ, যে চাইলে আফ্রিকার মাটি খুঁড়ে রক্তহীরা (Blood Diamond) বের করে আনতে পারে, চাইলে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে এমনভাবে বদলে দিতে পারে যেন ফুটবল ক্লাবের কোচ বদলানো হচ্ছে, চাইলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এমন আগুন জ্বালাতে পারে—অথচ সেই আমেরিকা ইরানকে বশে আনতে পারছে না। এই ব্যর্থতা আমেরিকার কাছে শুধু কূটনৈতিক সমস্যা নয়, এটি আত্মসম্মানের প্রশ্ন। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটি যদি একটি তুলনামূলক দুর্বল, নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ও অর্থনৈতিক সংকটে কাতর রাষ্ট্রকে নিজের ইচ্ছামতো চালাতে না পারে, তবে আমেরিকার রাজনীতিকদের বুকের মধ্যে সেই ব্যর্থতা বিষফোড়ার মতো চুলকায়।
মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ও ‘চিকেন গেম’
মজার ব্যাপার হলো, ইরানকে নিয়ে আমেরিকার সমস্যাটি কেবল ট্যাংক, মিসাইল কিংবা ইউরেনিয়ামের নয়; আসল সমস্যা মনস্তত্ত্বে। আরও স্পষ্ট করে বললে, কে আগে চোখ নামাবে—লড়াইটা তার। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষায় একে বলে ‘চিকেন গেম’ (Chicken Game)। ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত ইরানের সঙ্গে এই চিকেন গেমটাই খেলতে চেয়েছিলেন।
খেলার ধরনটা বুঝিয়ে বলি। ধরুন, দুটি গাড়ি মুখোমুখি ছুটে আসছে। যে আগে সরে যাবে, তাকেই কাপুরুষ ধরা হবে। এখন একজন যদি ভাবে, “হারলে তো সবই গেল, তার চেয়ে ঝুঁকি নেওয়াই ভালো”, তাহলে সে সহজে সরে যাবে না। আর অন্যজন যদি ভাবে, “হারলে তো আমার সর্বনাশ হবে না, শুধু একটু অস্বস্তি হবে”, তাহলে সে শেষ মুহূর্তে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিতে পারে।
ইরানের জন্য এই লড়াইটা অস্তিত্বের। ইসলামি প্রজাতন্ত্র হারলে শুধু সরকার বদলাবে না—নেতাদের জীবন, পুরো শাসনব্যবস্থা এবং বিপ্লবের ইতিহাস সব ধসে পড়তে পারে। অন্যদিকে আমেরিকার জন্য এটি সর্বোচ্চ একটি রাজনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতি। ফলে, এই লড়াইয়ে কে বেশি মরিয়া, তা সহজেই অনুমেয়।
নীতিনির্ধারণের দ্বিধা ও ট্রাম্পের দ্বৈততা
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে আমেরিকা ঠিক করতে পারেনি যে তারা আসলে কী চায়। তারা কি শুধু ইরানের কিছু নীতি বদলাতে চায়, নাকি পুরো ইসলামি প্রজাতন্ত্রই গুঁড়িয়ে দিতে চায়? এই দ্বিধাই আমেরিকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের একাংশ বলে, ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে, কারণ তাদের ছাড়া পারমাণবিক সংকট সামলানো যাবে না। আরেক অংশের দাবি, এই সরকার অবৈধ, এদের টিকতেই দেওয়া উচিত নয়। ফলে ওয়াশিংটনের নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে দিকভ্রান্ত।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় এই দ্বৈততা সবচেয়ে বেশি নাটকীয় রূপ নেয়। সকালে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছেন, “ইরানের চার দশকের অসাধু শাসনের শেষ সময় এসে গেছে।” দুপুরে আবার বলছেন, “আলোচনা খুব ভালো এগোচ্ছে।” বিকেলে দিচ্ছেন যুদ্ধের হুমকি! কিন্তু ইরান এই মনস্তত্ত্ব খুব ভালো বোঝে।
ইরাক-আফগানিস্তানের ভূত ও ধৈর্যের যুদ্ধ
ইরান জানে, আমেরিকা যুদ্ধ করতে পারে, নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ভয় আমেরিকার প্রবল। কারণ, ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা এখনো ওয়াশিংটনের মাথায় হাতুড়ির মতো বাজে। আমেরিকা একসময় ভেবেছিল, সাদ্দাম হোসেনকে সরালেই ইরাক আমেরিকার ‘বাগান’ হয়ে যাবে। ফল হলো উল্টো—বাগানের বদলে এমন জঙ্গল তৈরি হলো, যেখান থেকে আইএসের মতো দানব বেরিয়ে এল। আফগানিস্তানে দুই দশক যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত তালেবানের কাছেই ক্ষমতা ছাড়তে হলো। ফলে আমেরিকার জনগণ এখন যুদ্ধের কথা শুনলেই আতঙ্কিত হয়।
ইরান আমেরিকার এই ক্লান্তিটা বোঝে। তাই তারা সরাসরি যুদ্ধের বদলে ‘ধৈর্যের যুদ্ধ’ খেলছে। তারা নিষেধাজ্ঞা সহ্য করছে, অর্থনৈতিক চাপ টিকিয়ে রাখছে এবং সামরিক হুমকির বিপরীতে পাল্টা হুমকি দিচ্ছে।
পরিচয়ের রাজনীতি ও চুক্তির উল্টো ফল
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইরানে আমেরিকার বিরোধিতা কেবল পররাষ্ট্রনীতি নয়, এটি রাষ্ট্রের পরিচয়ের অংশ। আপনি যদি ইরানের শাসকদের বলেন, “আমেরিকার সামনে মাথা নত করো”, তাহলে সেটি তাদের কাছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, আত্মহত্যার সমান। কারণ, তাদের পুরো বৈধতা এর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।
বারাক ওবামা এই বাস্তবতা বুঝেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, অন্য ধরনের সরকার হলে হয়তো ভালো হতো, কিন্তু বাস্তবে এই সরকারকেই মোকাবিলা করতে হবে। তাই তিনি পারমাণবিক চুক্তি করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সবচেয়ে বিপজ্জনক কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। চুক্তিটি কার্যকরও হয়েছিল—ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমিয়েছিল এবং উত্তেজনা কিছুটা কমেছিল।
কিন্তু আমেরিকার ডানপন্থিদের কাছে এটি ছিল আত্মসমর্পণ। ট্রাম্প যখন চুক্তি থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন ফল হলো উল্টো। ইরানের উদারপন্থিরা দুর্বল হয়ে গেল, কট্টরপন্থিরা বলল, “দেখেছ, আমেরিকাকে বিশ্বাস করা যায় না।” এরপর তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ আরও বাড়িয়ে দিল। অর্থাৎ, আমেরিকা যা ঠেকাতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই আরও ত্বরান্বিত হলো।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও আমেরিকার স্বীকৃতি
১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর আমেরিকা রাশিয়াকে শত্রু বানিয়েছিল। পরে তারা বুঝল, পুরোপুরি অস্বীকার করে লাভ নেই। তাই ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি দিলেন। পরে হেনরি কিসিঞ্জার সোভিয়েতদের সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করলেন। আদর্শ আলাদা হতে পারে, কিন্তু পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকাতে কথা বলতেই হয়।
ইরানের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। আমেরিকা আদর্শগতভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে অপছন্দ করতে পারে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি রাজনীতি এবং পারমাণবিক ইস্যুতে আমেরিকার ইরানকে দরকার। এখানেই ইরানের সবচেয়ে বড় জয়—তারা বুঝে গেছে যে আমেরিকারও তাদের প্রয়োজন আছে। তেহরানের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি শুধু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া নয়, বরং আমেরিকার কাছ থেকে ‘স্বীকৃতি’ পাওয়া। এ কারণেই ইরান কখনো পুরোপুরি মাথা নত করে না। তারা জানে, শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকে আবার তাদের দরজায় কড়া নাড়তেই হবে।
সব শেষে আসল কথাটা হলো—আমেরিকা ইরানকে বশে আনতে পারছে না, কারণ ট্যাংক দিয়ে সব যুদ্ধ জেতা যায় না। কিছু যুদ্ধ হয় বিশ্বাসের, কিছু যুদ্ধ হয় অস্তিত্বের। তাকে কেবল বোমা মেরে পরাস্ত করা যায় না। তাকে হয় বুঝতে হয়, নয়তো তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় বসবাস করতে শিখতে হয়। আমেরিকা এখনো ঠিক করতে পারেনি, সে কোনটা করবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস২৪