• শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৮ পূর্বাহ্ন
Headline
গ্রামে মারাত্মক লোডশেডিং: জ্বালানি সংকট উত্তরণে মন্ত্রীদের আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান রিজভীর আরও ১০০০ মাদ্রাসায় কারিগরি ট্রেড কোর্স চালুর ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর বিবি আছিয়া: নারী সমাজের এক অনন্য অনুপ্রেরণা যুদ্ধের প্রভাবে ইরানে ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ প্রার্থীর সবার মনোনয়ন বৈধ আদর্শের লড়াইয়ে বিজেপিকে কেবল কংগ্রেসই হারাতে পারে: রাহুল গান্ধি বিধানসভা নির্বাচন: পশ্চিমবঙ্গবাসীর প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদির বিশেষ বার্তা দুই দশক পর গাজার দেইর আল-বালাহ শহরে পৌর নির্বাচন হরমুজ প্রণালীতে টোল আদায়: ইরানের কোষাগারে জমা হলো প্রথম আয়

সংস্কারের হোঁচট: কার্যকারিতা হারাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ২০ অধ্যাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা / ১৯ Time View
Update : শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া বেশ কিছু মৌলিক সংস্কার উদ্যোগ বড় ধরনের হোঁচট খেতে যাচ্ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনয়ন এবং গুম প্রতিরোধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে জারি করা অন্তত ২০টি অধ্যাদেশ বাতিলের মুখে পড়েছে। জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি এসব অধ্যাদেশ হুবহু গ্রহণ না করে হয় রহিত করার, না হয় অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের নামে ঝুলিয়ে রাখার সুপারিশ করেছে।

আইনি মারপ্যাঁচে আগামী ১০ এপ্রিলের পর এই ২০টি অধ্যাদেশ তাদের কার্যকারিতা হারাবে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আইনি বৈধতা পাওয়ার আগেই অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার পথে।

বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক বিভক্তি

গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে একটি বিশদ প্রতিবেদন জমা দেন। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে (১২ মার্চ) এই অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপিত হওয়ার পর সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু পাসের সুপারিশ করা হলেও, ২০টি অধ্যাদেশ নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র মতভেদ। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর তিন সংসদ সদস্য এই ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাদের দাবি, এই অধ্যাদেশগুলো সংস্কারের মূল স্তম্ভ ছিল এবং এগুলো বাতিল করা মানে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে অবজ্ঞা করা।

রহিত হতে যাওয়া চার স্তম্ভ: বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কী হবে?

বিশেষ কমিটি চারটি অধ্যাদেশ সরাসরি রহিত বা বাতিল করার জন্য বিলে সুপারিশ করেছে। এই তালিকায় রয়েছে: ১. জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ। ২. সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ। ৩. সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫। ৪. সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬।

বিচারক নিয়োগের সংকট: বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের অধ্যাদেশ জারি করেছিল। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করার বিধান ছিল। এই অধ্যাদেশটি বাতিল হলে বিচারক নিয়োগে আবারও রাজনৈতিক বিবেচনার চিরচেনা প্রথা ফিরে আসার পথ প্রশস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বতন্ত্র সচিবালয়: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাবিষয়ক ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত হওয়ার কথা ছিল। বিশেষ কমিটির এই বাতিলের সুপারিশের ফলে বিচার বিভাগ পুনরায় নির্বাহী বিভাগের ছায়াতলে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল।

অপেক্ষমাণ ১৬ অধ্যাদেশ: গুম ও দুর্নীতির বিচার কি অধরাই থাকবে?

কমিটি ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে না তুলে ‘অধিকতর শক্তিশালী’ করার সুপারিশ করেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, ১০ এপ্রিলের ডেডলাইনের আগে এগুলো পাস না হলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এই তালিকায় রয়েছে:

  • গুম প্রতিরোধ আইন: প্রথমবারের মতো গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করে যে অধ্যাদেশ হয়েছিল, তা অনিশ্চয়তার মুখে। সরকারি দলের যুক্তি হলো—নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে পূর্বানুমতি লাগবে। বিপরীতে বিরোধী দল বলছে, অনুমতির এই বিধান মূলত ‘দায়মুক্তি’র নামান্তর।

  • দুদকের ক্ষমতা: দুদকের সরাসরি এজাহার দায়ের এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষমতা বাড়িয়ে করা অধ্যাদেশটিও ঝুলে গেছে। জামায়াতের সদস্যরা দাবি করেছেন, দুর্নীতি রোধে এটি ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা সরকারি দল রাজনৈতিক কারণে বাতিল করতে চায়।

  • গণভোট ও মানবাধিকার: জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ‘গণভোট অধ্যাদেশ’ এবং মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন করার উদ্যোগগুলোও একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মানবাধিকার কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে না থাকলে তদারকি করা কঠিন হবে। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন—দুদক বা নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীন থাকতে পারে, তবে মানবাধিকার কমিশন কেন নয়?

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও দায়মুক্তি: যা হুবহু পাস হচ্ছে

৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাসের সুপারিশের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ’। এটি মূলত অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষা বা দায়মুক্তি দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। এছাড়া জুলাই শহীদদের পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোও কোনো পরিবর্তন ছাড়াই পাসের সুপারিশ করা হয়েছে।

পাশাপাশি, পূর্ববর্তী সরকারের আমলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামের পরিবর্তন (বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা বা শেখ হাসিনার নাম বাদ দেওয়া সংক্রান্ত) এবং সাইবার সুরক্ষা ও সরকারি চাকরি সংক্রান্ত কিছু অধ্যাদেশও হুবহু গৃহীত হচ্ছে। তবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অধ্যাদেশগুলোতে ‘প্রশাসক নিয়োগের’ বিধান নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি রয়ে গেছে।

সংশোধিত ১৫ অধ্যাদেশ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত

১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়েছিল। সংশোধনীতে নিষিদ্ধ কোনো দলের হয়ে মিছিল-মিটিং করলে শাস্তির কঠোর বিধান যুক্ত হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ’ সংশোধিত আকারে পাস হবে, যা পুলিশের নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

১০ এপ্রিলের আলটিমেটাম ও আগামীর বাংলাদেশ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী সোমবার থেকে যখন এই বিলগুলো সংসদে উঠবে, তখন সংসদ কক্ষ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। ১০ এপ্রিলের মধ্যে যদি ২০টি অধ্যাদেশ পাস না হয়, তবে সেগুলোর আইনি ভিত্তি শেষ হয়ে যাবে। এর ফলে একদিকে যেমন গুম হওয়া পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা ক্ষীয়মাণ হবে, অন্যদিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরায় প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়েও দেশে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা বৃহৎ সংস্কার কাজগুলো যখন নির্বাচিত সংসদের হাতে এসে হোঁচট খাচ্ছে, তখন ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় দানা বাঁধছে। আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক অঙ্গন এই সংস্কারের প্রশ্নে আরও উত্তপ্ত হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।


অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ ছিল এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদে এসে সেই রূপরেখার বড় একটি অংশ কাটছাঁট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার সংক্রান্ত মৌলিক সংস্কারগুলো যদি মুখ থুবড়ে পড়ে, তবে তা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখন সবার নজর আগামী সোমবারের সংসদ অধিবেশনের দিকে—সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় স্বার্থ নাকি দলীয় সংকীর্ণতাকে প্রাধান্য দেয়, সেটাই দেখার বিষয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category