• মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ন
Headline
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমান সম্পর্কে আবুল হায়াতের আবেগঘন স্মৃতিচারণ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ চাঁদপুরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে যাত্রীবাহী লঞ্চ আহত অর্ধশতাধিক গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ শিশু রামিসা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল শুনানি জুনে

সবাই চায় জুলাই সনদ, তবু কেন সংসদজুড়ে সংকটের মেঘ?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক | ঢাকা / ৪৩ Time View
Update : বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ‘জুলাই সনদ’ এখন বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তবে এই সনদ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা সংসদ থেকে রাজপথ—সবখানেই স্পষ্ট। বিএনপি, জামায়াত এবং ছাত্র প্রতিনিধিদের দল এনসিপির মধ্যে নীতিগত মিল থাকলেও পদ্ধতিগত বিরোধ এখন চরমে।

সংকটের মূলে কি ‘পদ্ধতি’ না কি ‘অতীত’?

সংকটের প্রথম কারণটি আইনি ও পদ্ধতিগত। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, রাষ্ট্রপতির আদেশে যেভাবে ‘গণভোট’ আয়োজন করা হয়েছে, তা অনেকটা ‘কলার ভেতরে তিতো ওষুধ’ খাওয়ানোর মতো। বিএনপির আপত্তি হলো, ব্যালট পেপারে মাত্র চারটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন দিয়ে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলতে বাধ্য করা হয়েছে, যা প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন নয়। তাদের মতে, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’।

জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার: প্রধান তিন পক্ষের অবস্থান

একনজরে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি-র রাজনৈতিক মেরুকরণ

রাজনৈতিক পক্ষ মূল দাবি ও লক্ষ্য আপত্তির জায়গা ও শঙ্কা
বিএনপি
(সালাহউদ্দিন আহমদ ও পার্থ)
• বিদ্যমান সংবিধানের অধীনে সংস্কার।
• দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে জনমতের প্রতিফলন।
• আইনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।
• গণভোটের পদ্ধতিকে ‘প্রতারণা’ মনে করা।
• পূর্ণ সংবিধান বাতিলে অরাজকতার শঙ্কা।
• বিপ্লবের নামে আইনি কাঠামো ধ্বংসের বিরোধ।
জামায়াতে ইসলামী
(ডা. শফিকুর রহমান)
• ৭২-এর সংবিধানের আমূল পরিবর্তন বা বাতিল।
• নতুন করে জাতীয় গঠনতন্ত্র তৈরি।
• গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় কার্যকর করা।
• বিএনপির ‘ধীরে চলো’ নীতিতে বিরক্তি।
• পুরনো সংবিধানের দোহাইকে ‘রাজনৈতিক ঘুণ্যামি’ বলা।
• একাত্তর বনাম চব্বিশের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বে অনড় অবস্থান।
এনসিপি / ছাত্র পক্ষ
(হাসনাত আব্দুল্লাহ)
• ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটি’ বা বিপ্লবের অগ্রাধিকার।
• পুরনো জরাজীর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিলোপ।
• জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্র গঠন।
• প্রথাগত রাজনীতিকদের ‘সুযোগ সন্ধানী’ মনে করা।
• সংবিধানকে বাইবেল মনে করার মানসিকতার বিরোধিতা।
• বিপ্লবের ফল হাইজ্যাক হওয়ার ভয়।
* সূত্র: জাতীয় সংসদ অধিবেশন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (এপ্রিল ২০২৬)

সংবিধান বনাম বিপ্লব: হাসনাত আব্দুল্লাহর চ্যালেঞ্জ

সংসদে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রথাগত রাজনীতিকদের ‘সুযোগ সন্ধানী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার যুক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ—যদি ৭২-এর সংবিধানকেই ‘বাইবেল’ মানতে হয়, তবে ৫ আগস্টের পর বেগম খালেদা জিয়া কোন সংবিধানে মুক্তি পেলেন? তিনি মনে করিয়ে দেন, সেই মুক্তি সম্ভব হয়েছিল ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটি’ বা বিপ্লবের প্রয়োজনে। এখন যখন সংবিধান সংস্কারের কথা আসছে, তখন কেন পুরনো সংবিধানের দোহাই দেওয়া হচ্ছে? একে তিনি ছাত্র-জনতার রক্তের সাথে প্রতারণা হিসেবে দেখছেন।

ব্যারিষ্টার পার্থের যুক্তি: ‘৩০০ রানের পর ১২ রান’

সংজোটের এই বিতর্কে আন্দালিব রহমান পার্থ একটি শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জামায়াত ও এনসিপির যুক্তির বিপরীতে বলেন, বিএনপি ও অন্যান্য দল গত ১৫ বছর ধরে রাজপথে রক্ত দিয়ে আন্দোলনের ‘৩০০ রান’ করে রেখেছে, আর ছাত্ররা এসে শেষ ‘১২ রান’ করে জয় নিশ্চিত করেছে। পার্থের মূল আপত্তি সংবিধান বাতিলে। তিনি মনে করিয়ে দেন, এটি কোনো ‘বিপ্লবী সরকার’ নয়, বরং সংবিধানের অধীনে শপথ নেওয়া ‘অন্তর্বর্তী সরকার’। তাই পূর্ণ সংবিধান বাতিল করার আইনগত সুযোগ নেই।

জামায়াতের কৌশল: একাত্তর বনাম চব্বিশ?

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, জামায়াতে ইসলামী কেন ৭২-এর সংবিধান পুরোপুরি বাতিল করতে চায়, তার পেছনে একটি সূক্ষ্ম উদ্দেশ্য থাকতে পারে। সংবিধান পুরোপুরি বাতিল হলে ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান’ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। জামায়াত হয়তো চাচ্ছে চব্বিশের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে একাত্তরের রাজনৈতিক দায়ভার থেকে নিজেদের মুক্ত করে নতুন একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে। তবে আমীর ডা. শফিকুর রহমান একে ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষা’ হিসেবেই বর্ণনা করছেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞের মত: ‘কাটা-ছেঁড়া’ না কি ‘নতুন ঘর’?

অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুমের মতো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় সংসদ সংবিধান ‘পরিবর্তন’ করতে পারে না, বড়জোর ‘সংশোধন’ করতে পারে। মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করলে উচ্চ আদালত তা বাতিল করে দিতে পারে। তাই প্রশ্ন উঠছে—বিদ্যমান সংবিধানের ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক করতে সংস্কারই কি যথেষ্ট নয়? নাকি আসলেই একটি নতুন সংবিধান প্রয়োজন?

সংকটের শেষ কোথায়?

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখন ‘পারস্পরিক অবিশ্বাস’। বিএনপি যেখানে আইনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করে দ্রুত নির্বাচনে যেতে চায়, জামায়াত ও এনসিপি সেখানে আমূল পরিবর্তনের পক্ষে। এই ‘আইনি ঘুণ্যামি’ এবং ‘রাজনৈতিক কৌশলের’ মারপ্যাঁচে জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট যেন হারিয়ে না যায়, সেটাই এখন সাধারণ মানুষের বড় শঙ্কা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category