মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে মানবপাচার ও শোষণের ভয়ংকর সিন্ডিকেট। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তাদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই চক্রের কারণে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক প্রতারণা, ঋণের বোঝা এবং বেকারত্বের মতো চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ আদায় এবং প্রতিশ্রুত কাজ না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন অনেক রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন করে এই শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে একটি চক্র। এই চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব: বিএনপি নেতা অলিআজগর লবি, গফুর ভূঁইয়া, বহিষ্কৃত নেতা কাজি মফিজ এবং বহিষ্কৃত যুবদল নেতা আতিকুর রহমান বিশ্বাস।
মূল হোতা ও পলাতক আসামি: মানবপাচার ও অর্থপাচার মামলার পলাতক আসামি রুহুল আমিন স্বপন এবং মালয়েশিয়া প্রান্তের নিয়ন্ত্রক দাতুক সেরি আমিন।
কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তা: সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্লাহ ভূঞা, তথাকথিত মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার বাবলুর রহমান খান, মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান, শ্রম কাউন্সিলর সৈয়দ শরিফুল ইসলাম এবং সাবেক ডেপুটি হাইকমিশনার খুরশেদ আলম খাস্তগীর।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এই সিন্ডিকেট ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল। ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের শাসনামলে দুর্নীতির কারণে কর্মী ভিসা বন্ধ হলেও, ২০২২ সালে পুনরায় বাজার চালু হয়। শুরুতে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নিয়ে কাজ শুরু হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে তা ১০০টিতে উন্নীত করা হয়।
লুটপাটের খতিয়ান: সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় মাত্র ৭৯ হাজার টাকা হলেও, সিন্ডিকেট চক্র প্রতিটি শ্রমিকের কাছ থেকে গড়ে ৫ লাখ থেকে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশি নিয়ন্ত্রকরা জনপ্রতি প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা এবং মালয়েশিয়ার নিয়ন্ত্রকরা ভিসাপ্রতি প্রায় দেড় লাখ টাকা আদায় করেন।
সাবেক হোতাবৃন্দ: বিগত সরকারের আমলে এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা ছিলেন লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদ এবং মালয়েশিয়ার দাতুক শ্রী আমিন। বাংলাদেশ প্রান্তে নিয়ন্ত্রক রুহুল আমিন স্বপন হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শ্রমিকদের অধিকার আদায় এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি পদক্ষেপ বর্তমানে চলমান রয়েছে:
১০৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা: ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আফিয়া ওভারসিজের মালিক আলতাফ খান পল্টন থানায় ১০৩ জন সিন্ডিকেট সদস্য ও রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মানবপাচার, চাঁদাবাজি ও মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করেন। সিআইডি প্রথমে এই মামলায় প্রভাবশালীদের ইশারায় একটি মনগড়া ‘ফাইনাল রিপোর্ট’ দেয়। তবে বাদী নারাজি দিলে গত বছরের শেষের দিকে আদালত তা বাতিল করে গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন।
ইন্টারপোলের নোটিশ: মূল হোতা আমিনুল ইসলাম ও রুহুল আমিন স্বপনকে দেশে ফেরাতে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর ইন্টারপোলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ।
সাবেক মন্ত্রীর স্বীকারোক্তি: এই মামলার ১ নম্বর আসামি, সাবেক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদকে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে ডিবি। রিমান্ডে তিনি স্বীকার করেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানার চাপে পড়েই এই সিন্ডিকেট হাজার হাজার কোটি টাকা লুটের সুযোগ পেয়েছিল এবং মন্ত্রী হয়েও তিনি ছিলেন নিরুপায়।
নাফিসা কামালের বিরুদ্ধে মামলা: অরবিটালস ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী নাফিসা কামাল ও মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ৩৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগে সিআইডি পৃথক মামলা করেছে। সরকার পতনের পর নাফিসা কামাল কৌশলে দেশ থেকে পালিয়ে যান।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা আগেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের অমানবিক জীবনযাপন ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেক শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পৌঁছে কাজ না পেয়ে ইমিগ্রেশনের হাতে আটক হয়ে জেল খেটে খালি হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার যদি শক্ত হাতে এই শ্রমবাজার সিন্ডিকেটকে দমন করতে ব্যর্থ হয়, তবে বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়সঙ্গত নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই খাতের হারানো স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।