• মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৮ অপরাহ্ন
Headline
মাদক ও সাইবার অপরাধ রুখতে কড়া হুঁশিয়ারি আইজিপির কলেজছাত্র হত্যায় ৭ জনের ফাঁসি স্বস্তিতে শুরু মাধ্যমিকের লড়াই: প্রশ্নফাঁসের শঙ্কা উড়িয়ে দিলেন শিক্ষামন্ত্রী বাসের ভাড়ায় আসছে সমন্বয়, সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে ‘আঞ্চলিক’ নববর্ষের রূপরেখা ত্যাগের মূল্যায়নে স্বজন-ছায়া: নারী আসনে বিএনপির ৩৬ মুখ জোটের শরিকদের ছাড়, নারী আসনে জামায়াত-এনসিপির চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত গম পাচার কেলেঙ্কারি: ভোটের মুখেই ইডির তলবে বিপাকে নুসরাত ব্যাট ছেড়ে মালিকানায় ‘ইউনিভার্স বস’: স্কটিশ ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনলেন গেইল জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—সরকারের সাশ্রয়ের বিপরীতে কতটা পুড়ছে সাধারণ মানুষ? চার দেওয়াল পেরিয়ে দেশ গড়ার অঙ্গীকার: নারী আসনের ভোটে সরগরম নির্বাচন ভবন

সিন্ডিকেটের পেটে সাধারণের বাহন: রিংমাস্টারদের হাতে জিম্মি ৫০ লাখ যাত্রী

Reporter Name / ১৬ Time View
Update : বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

বিশ্বের যেকোনো দেশে গাড়ি শোরুম থেকে রাস্তায় নামলে তার দাম কমে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ঘটে এক অদ্ভুত ভেলকিবাজি। এখানে একটি সাধারণ সিএনজি অটোরিকশার আয়ুষ্কাল যত ফুরোয়, তার দাম তত বাড়ে! একটি একেবারে নতুন, চকচকে সিএনজি অটোরিকশার বাজারমূল্য মাত্র ৬ লাখ টাকা। কিন্তু সেই গাড়িটি কিনে যদি আপনি ঢাকার রাস্তায় নামাতে চান, তবে আপনাকে গুনতে হবে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকা!

শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও, এটাই ঢাকা মহানগরীর প্রতিদিনের রূঢ় বাস্তবতা। একটি সাধারণ তিন চাকার বাহনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কোটি টাকার এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য। যেখানে মূল্যের চারগুণ টাকা শুধু হাওয়ায় উড়ে যায় একটি ‘নম্বর প্লেট’ বা নিবন্ধনের পেছনে। চোখের সামনে চলা এই প্রকাশ্য ডাকাতি ও লুটপাট যেন ‘টিনের চশমা’ পরে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

যেভাবে শুরু এই গোলকধাঁধার

গল্পের শুরুটা আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে। পেট্রোল ও ডিজেলচালিত টু-স্ট্রোক অটোরিকশার (বেবিট্যাক্সি) বিষাক্ত কালো ধোঁয়া থেকে ঢাকাকে বাঁচাতে ২০০১ সালে পথে নামে সবুজ রঙের পরিবেশবান্ধব সিএনজি অটোরিকশা। ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ঢাকায় প্রায় ১৩ হাজার সিএনজির নিবন্ধন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মিশুকের প্রতিস্থাপন হিসেবে আরও ২ হাজার ৬৯৬টি যুক্ত হয়। বিআরটিএ-এর তথ্যমতে, সব মিলিয়ে গত দুই দশকে ঢাকায় প্রায় ২০ হাজার ৯৯৫টি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বৈধভাবে রাস্তায় চলছে ১৫ হাজার ৬৯৬টি সিএনজি।

প্রতিটি সিএনজির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছিল ১৫ বছর। নিয়ম অনুযায়ী, ১৫ বছর পর গাড়িটি স্ক্র্যাপ (ধ্বংস) করে মালিককে নতুন একটি গাড়ি একই নিবন্ধনের বিপরীতে রাস্তায় নামানোর সুযোগ দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় ‘রিপ্লেসমেন্ট’। আর এই একটি মাত্র নিয়মের ফাঁক গলেই জন্ম নিয়েছে পরিবহন খাতের সবচেয়ে ভয়ংকর সিন্ডিকেট।

২৫ লাখের সমীকরণ: একটি লোহার পাতের দাম ১৫ লাখ!

একটি নতুন সিএনজি কিনে রাস্তায় নামানো কেন সাধারণ চালকদের কাছে ‘সোনার হরিণ’? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সহজ একটি হিসাবে।

শোরুম থেকে একটি নতুন সিএনজি কিনতে বর্তমানে খরচ হয় ৫ লাখ ৭৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা। বিআরটিএ-তে সরকারি ফি হিসেবে কাগজপত্রের জন্য জমা দেওয়ার কথা মাত্র ১২ হাজার ৪৩৯ টাকা। কিন্তু আপনি চাইলেই এই ১২ হাজার টাকা দিয়ে নিবন্ধন পাবেন না, কারণ ঢাকায় নতুন সিএনজির নিবন্ধন সম্পূর্ণ বন্ধ!

তাহলে উপায়? উপায় হলো ওই ১৫ বছর পুরোনো বাতিল হওয়া গাড়ির ‘নম্বর প্লেট’ কেনা। আর এখানেই ওত পেতে থাকে দালাল, অসাধু মালিক ও ট্রাফিক পুলিশের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। একটি পুরোনো নম্বর প্লেট কিনতেই দালালদের মাধ্যমে ক্রেতাকে গুনতে হয় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এর সঙ্গে সেই ভাঙাচোরা, লক্কড়ঝক্কড় পুরোনো গাড়িটির মূল মালিককে দিতে হয় আরও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে, ৬ লাখ টাকার একটি গাড়ি রাস্তায় বৈধভাবে নামাতে খরচ গিয়ে দাঁড়ায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকায়!

ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শেখ হানিফের কণ্ঠে ঝরে পড়ে চরম হতাশা, “সারা বিশ্বে পুরোনো জিনিসের দাম কমে, কিন্তু ঢাকার সিএনজির পুরো খেলাই হচ্ছে নম্বর প্লেট নিয়ে। যে নম্বর প্লেটের সরকারি মূল্য মাত্র সাড়ে ১২ হাজার টাকা, সেটিই কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে লাখ লাখ টাকায়।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, তৎকালীন প্রভাবশালী শ্রমিক নেতা শাজাহান খান এবং ওসমান আলীদের অসাধু চক্র নতুন সিএনজি নামানোর অনুমতি আটকে দিয়ে এই ‘রিপ্লেসমেন্ট’ বাণিজ্যের জন্ম দিয়েছিল, যা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

কালো টাকার উৎসব: ‘ব্রিফকেস পার্টি’র কবলে পরিবহন খাত

এই আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ কোনো চালকের পক্ষেই এখন আর সিএনজির মালিক হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কারা কিনছে এসব সিএনজি?

সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদের সভাপতি মো. বরকত উল্লাহ ভুলু উন্মোচন করেছেন এক ভয়ংকর সত্য। তিনি জানান, বর্তমানে এই খাতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের চেয়ে ‘ব্রিফকেস পার্টি’ বা কালো টাকার মালিকদের দৌরাত্ম্য বেশি। “মানুষের হাতে এখন অনেক অবৈধ টাকা। সেই ঘুষ বা দুর্নীতির কালো টাকা বৈধ করতে অনেকেই সিএনজি ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। তারাই লাখ লাখ টাকা দিয়ে পুরোনো নম্বর প্লেট কিনছেন।”

এই কালো টাকার আগ্রাসনের কারণে বর্তমানে ঢাকার প্রায় ১৬ হাজার সিএনজি অটোরিকশা জিম্মি হয়ে আছে মাত্র এক হাজার প্রভাবশালী মালিকের হাতে। এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি প্রায় ৫০ হাজার চালক এবং প্রতিদিন যাতায়াত করা প্রায় ৫০ লাখ সাধারণ যাত্রী।

জিম্মি চালক, বলির পাঁঠা যাত্রী

একজন মালিক যখন ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে একটি সিএনজি রাস্তায় নামান, তখন তার মূল লক্ষ্য থাকে যেকোনো মূল্যে টাকা তুলে আনা। চালকদের কোনো বৈধ নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। মালিকদের বেঁধে দেওয়া অতিরিক্ত ‘জমা’ (দৈনিক ভাড়া) তুলতে গিয়ে চালকরা বাধ্য হন যাত্রীদের গলা কাটতে। মিটারে না যাওয়া, মনগড়া ভাড়া হাঁকানো, কিংবা গন্তব্যের কাছাকাছি গিয়ে ‘গ্যাস নেই’ বলে যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়ার মতো নৈরাজ্য মূলত এই ২৫ লাখি সিন্ডিকেটেরই ফসল।

অন্যদিকে, নগরজুড়ে লাখ লাখ অবৈধ ও অনিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত রিকশা (ইজি বাইক) অবাধে দাপিয়ে বেড়ালেও, বৈধ সিএনজির সংখ্যা না বাড়িয়ে সরকার মূলত এই সিন্ডিকেটকেই পরোক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, সিএনজির দামের এই অস্থিরতা থামাতে হলে নীতিগতভাবে নিবন্ধনের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে হবে। তিনি বলেন, “নিষেধাজ্ঞার কারণেই এই খাতটি একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তবে শুধু নিবন্ধন দিলেই হবে না, শহরের রাস্তার সক্ষমতার বিষয়টিও ভাবতে হবে। সরকার নিবন্ধন না দেওয়ায় হাজার হাজার অবৈধ সিএনজি চলছে, এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।”

অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী মনে করেন, “দূষণের শীর্ষে থাকা ঢাকায় এই ধরনের খোলা বাহন আর উপযুক্ত নয়। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের এখন উন্নত ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্যাক্সিক্যাব চালুর দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।”

সমাধান কোন পথে?

চাপের মুখে বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর জানিয়েছেন, ঢাকা জেলার চালকদের বঞ্চনা ঘোচাতে নতুন করে এক হাজার সিএনজির নিবন্ধন দেওয়ার একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

কিন্তু পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই এক হাজার সিএনজি সিন্ডিকেটের মহাসমুদ্রে একবিন্দু জলের মতো। যতক্ষণ না পর্যন্ত ‘নম্বর প্লেট’ বাণিজ্যের এই শেকড় উপড়ে ফেলা হচ্ছে, এবং পরিবহন খাতকে কালো টাকার প্রভাবমুক্ত করা যাচ্ছে, ততক্ষণ ঢাকার রাস্তায় এই ২৫ লাখ টাকার লোহার খাঁচার নিচে পিষ্ট হতে থাকবে সাধারণ চালক ও যাত্রীদের স্বপ্ন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category