সোনাদিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে ১৮ মিটার গভীরতার আন্তর্জাতিক মানের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে ১৩ দশমিক ৪ মিটার ড্রাফটের মাতারবাড়ী বন্দরকে বিকল্প হিসেবে নেওয়ায় বাংলাদেশ বড় ধরনের কৌশলগত সম্ভাবনা হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো বাংলাদেশকে এখন মাতারবাড়ী বন্দর নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। ’
রোববার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ‘নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিস’ আয়োজিত ‘মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর: ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যালোচনা’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ২০০৯ সালে কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেখানে ১৮ মিটার প্রাকৃতিক গভীরতা থাকায় বড় মাদার ভেসেল সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ ছিল। বন্দরটি নির্মিত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারত। ২০১৪ সালে চীন এ প্রকল্পে অর্থায়নে প্রস্তুত থাকলেও আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক পরাশক্তির চাপের কারণে তৎকালীন সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, সোনাদিয়া প্রকল্প বাতিলের ক্ষেত্রে পরিবেশ, ইকোট্যুরিজম, কচ্ছপ ও পাখির আবাসস্থল এবং পলি জমার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছিল। তবে এসব যুক্তির আড়ালে মূলত আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি কাজ করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারত।
মাতারবাড়ী বন্দর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুরুতে এটি গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে পরিকল্পিত ছিল না। মূলত ১২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানির জেটি ও অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সোনাদিয়া প্রকল্প বাদ পড়ার পর মাতারবাড়ীকে গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, সোনাদিয়ার ১৮ মিটার প্রাকৃতিক গভীরতার বিপরীতে মাতারবাড়ী বন্দরের ড্রাফট ১৩ দশমিক ৪ মিটার। ফলে পলি অপসারণ ও নিয়মিত ড্রেজিংয়ের ওপর এ বন্দরের সক্ষমতা নির্ভরশীল থাকবে। বন্দর না হওয়ার চেয়ে মাতারবাড়ী বন্দর হওয়া অবশ্যই ভালো, কিন্তু সোনাদিয়ায় যে সম্ভাবনা ছিল, মাতারবাড়ী দিয়ে তা পূরণ হবে না। এটি বাংলাদেশের বড় ধরনের কৌশলগত সুযোগ হারানোর উদাহরণ।
জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে দলীয় রাজনীতি ও বিদেশি শক্তির স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে দেশের ভূ-অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন এই জামায়াত নেতা।
নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসিরের সভাপতিত্বে গোলটেবিল সংলাপে আরও বক্তব্য দেন সাবেক মেজর জেনারেল আমসা আমিন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ, ড. সিব্বির মাহমুদ এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।