• রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ০৪:৩৪ অপরাহ্ন
Headline
সীমান্তে রক্তপাত বন্ধ না করলে ভারতের সঙ্গে স্থায়ী বন্ধুত্ব অসম্ভব: রুহুল কবির রিজভী নৌযাত্রা শতভাগ নিরাপদ করতে সর্বোচ্চ সতর্ক সরকার: নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আসন্ন বাজেটে জ্বালানি, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিপুল ভর্তুকি বাড়াচ্ছে সরকার সোশ্যাল মিডিয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে জনসচেতনতা কার্যক্রমে বড় বাধা: তথ্যমন্ত্রী শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতিতেও গণতন্ত্র থাকতে হবে: অর্থমন্ত্রী মা দিবসে মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে সেরা ৮টি স্মার্ট গ্যাজেট ‘পুলিশকে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না’ — পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোড়া হত্যা মামলায় আসাদুজ্জামান নূরের জামিন: হাইকোর্টের আদেশে কারামুক্তির পথে ‘বাকের ভাই’ সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দিকে এগোচ্ছে সরকার

হামের ৩৫২ শিশুর মৃত্যু: পরিবারপ্রতি ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে রিট

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

একটি শিশুর মৃত্যু মানে কেবল একটি প্রাণের অবসান নয়, বরং একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন, আশা এবং ভবিষ্যতের সলিল সমাধি। আর সেই মৃত্যু যদি হয় হামের মতো একটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগে, তবে তা আর কেবল নিয়তির পরিহাস থাকে না; তা পরিণত হয় একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা এবং গাফিলতির জ্বলন্ত প্রমাণে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই উৎকর্ষের যুগে এসে মাত্র ৫৫ দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশে হাম এবং এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে ৩৫২ জন নিস্পাপ শিশুর মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা গোটা জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই অভাবনীয় এবং হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির পর এবার মৃত শিশুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবিতে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

রোববার (১০ মে ২০২৬) সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ন কবীর পল্লব জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করেছেন। এই রিটে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া প্রতিটি শিশুর পরিবারকে ২ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য হাইকোর্টের কাছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এই স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের জন্য স্বাস্থ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে।


৫৫ দিনের দুঃস্বপ্ন: ৩৫২টি লাশের ভার বইবে কে?

রিট আবেদনে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। গত কয়েক সপ্তাহে দেশজুড়ে হামের প্রকোপ মহামারি আকার ধারণ করেছে। মাত্র ৫৫ দিনের মধ্যে ৩৫২ জন শিশুর মৃত্যু প্রমাণ করে যে, প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ জন শিশু এই প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা এবং এর আশপাশের কিছু বিভাগে এই সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং বস্তিগুলোতে এই ভাইরাসের বিস্তার ঘটেছে দাবানলের মতো। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। সঠিক সময়ে টিকা না পাওয়ার কারণেই মূলত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা হার্ড ইমিউনিটি (Herd Immunity) ভেঙে পড়েছে, যার চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে এই অবুঝ শিশুদের জীবন দিয়ে।


রিট আবেদনের আইনি ভিত্তি ও দাবি

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ন কবীর পল্লব তাঁর রিট আবেদনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলে ধরেছেন:

১. সংবিধানের লঙ্ঘন: বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জীবনের অধিকার (Right to Life) এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাধ্য। হামের টিকা একটি মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার। রাষ্ট্রের অবহেলা ও টিকার সংকটের কারণে শিশুদের মৃত্যু সরাসরি সংবিধানের লঙ্ঘন।

২. ক্ষতিপূরণের যৌক্তিকতা: একটি শিশুর জীবনের কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে পরিবারপ্রতি ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে মূলত রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য। এই ক্ষতিপূরণ শুধু পরিবারগুলোর জন্য সান্ত্বনা নয়, বরং এটি স্বাস্থ্য প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যাতে ভবিষ্যতে এমন অবহেলার পুনরাবৃত্তি না হয়।

৩. দায়ীদের চিহ্নিতকরণ: রিটে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে। কেন এই টিকার সংকট তৈরি হলো এবং কেন আগে থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—তার একটি বিচার বিভাগীয় বা স্বাধীন তদন্তের দাবিও আইনি মহলে জোরালো হচ্ছে।


টিকা সংকট ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা

বাংলাদেশ একসময় শিশু টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) সারা বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল। পোলিও, ধনুষ্টঙ্কার এবং হাম নির্মূলে বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (WHO) একাধিকবার স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সেই গর্বের ইতিহাস আজ ম্লান হয়ে গেছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, হঠাৎ কেন এই স্বাস্থ্য বিপর্যয়?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত কয়েকমাস ধরেই দেশব্যাপী হামের টিকার (Measles-Rubella Vaccine) তীব্র সংকট চলছিল। বিভিন্ন হাসপাতাল ও টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে শিশুদের নিয়ে গিয়েও টিকা না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন হাজার হাজার অভিভাবক। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে টিকা আমদানিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সরবরাহ ব্যবস্থায় চরম দুর্নীতি এবং নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার অভাবেই আজ এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে এই বিশাল শূন্যতা তৈরি হওয়ার ফলেই ভাইরাসটি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।


সরকারের টনক নড়ল, কিন্তু বড্ড দেরিতে!

৩শ’র বেশি শিশুর প্রাণহানির পর অবশেষে সরকারের টনক নড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “টিকার সংকট এবং হামে শিশুমৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর কারণ অনুসন্ধানে সরকার ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। হামে কেন এতগুলো শিশুর মৃত্যু হলো, টিকা সরবরাহে কোথায় ঘাটতি ছিল এবং এই ক্ষেত্রে কারও কোনো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতি ছিল কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।”

তবে সরকারের এই তদন্তের আশ্বাস সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারছে না। সচেতন মহলের প্রশ্ন—যখন টিকার সংকট শুরু হয়েছিল, তখন কেন জরুরি ভিত্তিতে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলো না? মৃত্যুর সংখ্যা তিনশ পার হওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করাকে অনেকেই ‘চোর পালানোর পর বুদ্ধি বাড়ার’ সাথে তুলনা করছেন।


বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা ও করণীয়

দেশের প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ এবং ভাইরোলজিস্টরা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, শুধু টিকার সংকটই নয়, এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সতর্কতা:

  • লক্ষণ চেনা: শিশুদের মধ্যে হঠাৎ তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং জ্বরের ৩-৪ দিন পর সারা শরীরে লালচে র‍্যাশ (Rash) বা দানা দেখা দিলে তা হামের লক্ষণ হিসেবে ধরতে হবে।

  • দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া: অনেক অভিভাবক হামকে সাধারণ জ্বর বা ‘পোকায় কামড়ানো’ ভেবে অবহেলা করেন, যা শিশুর জন্য মারাত্মক হতে পারে। হামের কারণে নিউমোনিয়া বা ব্রেন ইনফেকশন (এনকেফালাইটিস) হয়ে শিশুর মৃত্যু ঘটার ঝুঁকি থাকে। তাই লক্ষণ দেখামাত্রই শিশুকে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের কাছে বা নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

  • বিচ্ছিন্ন রাখা: হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় আক্রান্ত শিশুকে সুস্থ শিশুদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা আইসোলেশনে রাখতে হবে।


 জবাবদিহিতা ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের দায়

৩৫২টি শিশুর মৃত্যু কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কফিনে ঠুকে দেওয়া ৩৫২টি পেরেক। এই শিশুদের মায়েরা আজ যে বুকফাটা আর্তনাদ করছেন, তার দায় কোনোভাবেই রাষ্ট্র বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। হাইকোর্টে দায়ের করা এই রিট কেবল একটি আইনি লড়াই নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য অধিকার আদায়ের একটি জাতীয় সংগ্রাম।

বিচারপতিরা যদি এই রিটের যৌক্তিকতা বিবেচনা করে যুগান্তকারী কোনো রায় বা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন, তবে তা আগামী দিনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমরা আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি হতে দেখতে চাই না। রাষ্ট্রযন্ত্রের ঘুম ভাঙুক, স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ফিরে আসুক মানবিকতা—এটাই এখন সমগ্র দেশবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।



আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category