মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে ২০২২ সালের সেই ঐতিহাসিক ও নাটকীয় শিবসেনা ভাঙনের স্মৃতি আবারও ফিরে আসার জোরালো গুঞ্জন শুরু হয়েছে। উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি) শিবিরে আবারও বড় ধরনের ফাটল ধরার জল্পনার মাঝেই, দলটির রাজ্যসভার সদস্য ও প্রবীণ নেতা সঞ্জয় রাউত সংসদ সদস্য ‘কেনাবেচা’ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন। তাঁর দাবি, উদ্ধব শিবিরের সংসদ সদস্যদের দলবদল করানোর জন্য বিপুল অঙ্কের টাকা এবং চার্টার্ড বিমান ব্যবহার করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক পোস্টে সঞ্জয় রাউত লেখেন, ‘মহারাষ্ট্রের সংসদ সদস্যদের কিনতে… আজ রাতে প্রত্যেককে ১৫ কোটি রুপি করে অগ্রিম দেওয়া হচ্ছে। এই তথ্য অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং ঘৃণ্য!’ অবশ্য একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, এই মুহূর্তে দলের ওপর বড় কোনো বিপদ নেই এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা তাদের রয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) সকালে সঞ্জয় রাউত আরেকটি বিস্ফোরক দাবি করে বলেন, নান্দেদ বিমানবন্দর থেকে শিবসেনার (ইউবিটি) দুজন সংসদ সদস্যকে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি বিশেষ চার্টার্ড বা প্রাইভেট বিমান পাঠানো হয়েছিল। দলবদলু সংসদ সদস্যদের তীব্র কটাক্ষ করে তিনি এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘যাদের একসময় রিকশায় চড়ারও সামর্থ্য ছিল না, আজ ঠাকরে নামের কল্যাণে তারা প্রাইভেট জেটে ঘোরার মতো দামী হয়ে উঠেছে। প্রতিটি বিষয়ের হিসাব নেওয়া হবে।’
দলীয় সূত্রে খবর, উদ্ধব শিবিরের ৯ জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে অন্তত ৬ থেকে ৭ জন বর্তমানে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন আসল ‘শিবসেনা’র সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এই তালিকায় সঞ্জয় দিনা পাতিল, সঞ্জয় দেশমুখ, নাগেশ পাতিল আশ্তিক্কর, ওমবাজে নিম্বালকর, ওয়াকচৌরে, সঞ্জয় যাদব এবং রাজাভাবু ওয়াজের নাম রয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে।
ভারতীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর খবর অনুযায়ী, এই বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা আজই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে একটি আলাদা গোষ্ঠী গঠনের চিঠি জমা দিতে পারেন। পরবর্তীতে তারা আইনগত জটিলতা এড়াতে শিন্ডে শিবিরের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে একীভূত হতে পারেন। ইতোমধ্যেই তারা দিল্লিতে একনাথ শিন্ডের পুত্র তথা সংসদ সদস্য শ্রীকান্ত শিন্ডের বাসভবনে মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের সঙ্গে এক গোপন বৈঠক সম্পন্ন করেছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে বিদ্রোহীদের ঠেকাতে এবং দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলছে উদ্ধব ঠাকরে পক্ষ। আজ বুধবার দিল্লিতে বেলা ১১টায় দলের সংসদীয় কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, এই বৈঠকে যে সমস্ত সংসদ সদস্যরা অনুপস্থিত থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় বিদ্রোহীদের কীভাবে বরখাস্ত করা যায়, তা নিয়ে আইনজীবীদের সঙ্গেও পরামর্শ করছে ঠাকরে পক্ষ। পাশাপাশি, উদ্ধব অনুগামী সংসদ সদস্য অরবিন্দ সাওয়ান্তও স্পিকার ওম বিড়লার কাছে সময় চেয়েছেন যাতে উদ্ধব ঠাকরের পক্ষ থেকে আগেভাগেই একটি চিঠি জমা দিয়ে আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।
মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহল মনে করছে, উদ্ধব ঠাকরে আবারও ২০২২ সালের মতো এক মহাসংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। সেবার একনাথ শিন্ডে ঠিক একইভাবে দল ভেঙে সিংহভাগ বিধায়ক নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে বিজেপির সহায়তায় সরকার গঠন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন থেকে আসল ‘শিবসেনা’ নাম ও দলীয় প্রতীক (ধনুক-তীর) ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।
গত রবিবার (১৪ জুন) উদ্ধব ঠাকরের মুম্বাইয়ের বাসভবন ‘মাতোশ্রী’তে আয়োজিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৫ জনই সশরীরে অনুপস্থিত থাকায় এই ভাঙনের গুঞ্জন প্রথম তীব্র রূপ নেয়। যদিও দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল তারা জুম অ্যাপে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু তার আগের দিন আদিত্য ঠাকরের জন্মদিনেও এই ৫ সদস্যকে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যায়নি। ফলে বোম্বে ও দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত নাটকীয় এবং তাত্পর্যপূর্ণ হতে চলেছে।
সূত্র: এনডিটিভি