দেশের বিদ্যুৎ খাতে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার ঘটাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহৃত অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানির ওপর থেকে করভার ১৭ শতাংশ থেকে এক ধাক্কায় মাত্র ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই নতুন কর-সুবিধার আওতায় সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, মাউন্টিং স্ট্রাকচার, ফটোভোলটাইক ব্যবস্থায় ব্যবহৃত লিথিয়াম ব্যাটারি এবং ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ওপর ১ শতাংশ ছাড়া বাকি সব ধরনের কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর মওকুফ করা হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এবারই প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক আমদানিকারকদেরও এই সুবিধার আওতাভুক্ত করা হয়েছে, যা আগামী ১৮০ দিন বা ছয় মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সিদ্ধান্তটি কেবল আমদানি ব্যয়ই কমাবে না, বরং সৌরবিদ্যুৎ খাতের প্রাথমিক বিনিয়োগ, উৎপাদনের খরচ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম নির্ধারণেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
তবে করভার ১৬ শতাংশ কমার অর্থ এই নয় যে, একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সার্বিক ব্যয়ও ঠিক ১৬ শতাংশই কমে যাবে। একটি পূর্ণাঙ্গ মেগা প্রকল্পে সৌর সরঞ্জামের পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, সিভিল ওয়ার্ক, গ্রিড সংযোগ এবং দেশীয় অর্থায়নের মতো আরও অনেক স্থানীয় ব্যয় যুক্ত থাকে। সাধারণত একটি প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ অর্থ আমদানি করা যন্ত্রপাতির পেছনে খরচ হয়। সেই সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, যদি কোনো প্রকল্পে আমদানিনির্ভরতা ৭০ শতাংশ হয়, তবে কর কমার ফলে ওই প্রকল্পের সার্বিক ব্যয় প্রায় ১১ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। আবার আমদানির পরিমাণ ৮০ শতাংশ হলে সাশ্রয় হতে পারে প্রায় ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। সহজ অঙ্কে হিসাব করলে, আগে ১০০ কোটি টাকার সরঞ্জাম আমদানিতে যেখানে ১৭ কোটি টাকা কর দিতে হতো, এখন তা মাত্র এক কোটি টাকায় নেমে আসবে, অর্থাৎ সরাসরি ১৬ কোটি টাকার বিশাল সাশ্রয় হবে।
এই বিপুল পরিমাণ প্রাথমিক ব্যয় সাশ্রয়ের সরাসরি প্রভাব পড়বে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি দাম বা ট্যারিফের ওপর। সাধারণত একটি সৌর প্রকল্পের মোট লেভেলাইজড খরচের প্রায় ৭০ শতাংশই হলো মূলধনি ব্যয়। সেই হিসাবে মূলধনি ব্যয় ১১ দশমিক ২ শতাংশ কমলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ৭ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসার কথা। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালে আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) সৌর প্রকল্পগুলোর জন্য গড়ে ৭ দশমিক ৮০ সেন্ট বা প্রায় ৯ দশমিক ১২ টাকা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হয়েছিল। নতুন কর-সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো গেলে এই দাম কমে ৮ দশমিক ৪৮ টাকার কাছাকাছি নেমে আসতে পারে। তবে এই সুবিধাটি ইতোমধ্যেই চুক্তি সম্পন্ন হওয়া প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে ৯১৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার ১২টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য চুক্তি সই করেছে, যেখানে বিদ্যুতের দাম ৭ দশমিক ৮০ থেকে ৯ দশমিক ১২ টাকা নির্ধারিত। আগামী ২০ বছরে এসব প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ কিনতে সরকারের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। যেহেতু এসব প্রকল্পের চুক্তি আগেই সম্পন্ন হয়েছে, তাই কর হ্রাসের সুবিধা সরাসরি সরকারি কোষাগারে ফেরত আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে যেসব নতুন প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি ও দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে, তারা এই শুল্কছাড়ের সবচেয়ে বড় সুফল ভোগ করবে।
এনবিআরের এই প্রজ্ঞাপনে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত। আগে এই ধরনের কর-সুবিধা কেবল শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। এখন বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা বাজারে প্রবেশ করায় সৌর সরঞ্জামের সহজলভ্যতা ও প্রতিযোগিতা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বড় মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানার রুফটপ সোলার, ছোট ব্যাটারি সিস্টেম এবং মাঝারি আকারের সৌর প্রকল্পগুলোও কম দামে সরঞ্জাম কিনতে পারবে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশে রুফটপ সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা ছিল ৪১৮ দশমিক ২ মেগাওয়াট। বাণিজ্যিক আমদানির দুয়ার খুলে যাওয়ায় এই সক্ষমতা ভবিষ্যতে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এই সম্ভাবনার আকাশে কিছু কালো মেঘও রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো ১৮০ দিনের সময়সীমা। একটি বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি নির্বাচন, পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ, পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (পিপিএ) স্বাক্ষর এবং গ্রিড সংযোগের অনুমোদন নিতেই প্রচুর সময় লেগে যায়। তাই মাত্র ছয় মাসের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে আমদানি পর্যায়ে পৌঁছানো অনেক প্রকল্পের জন্যই প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। ১৮০ দিন পর এই সুবিধা বহাল থাকবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ছাড়া শুধু কর কমালেই সৌরবিদ্যুতের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ সম্ভব নয়। এর জন্য সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জমির সহজলভ্যতা এবং দেশীয় ব্যাংকিং খাতে সুদের হার ও ডলারের বিনিময় মূল্যের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাধাগুলোও দূর করা প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমদানিকৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদ্যুতের ৪০ শতাংশের বেশি জ্বালানি বিদেশ থেকে আসে। এই অস্থিতিশীল বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর সক্ষমতা তৈরির যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, এই কর হ্রাস তারই একটি ইতিবাচক অংশ। এসআরইডিএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল মাত্র ১ হাজার ৩৮৫ মেগাওয়াট। আগামী দিনে এই সক্ষমতা বাড়াতে হলে সরকারকে তিনটি মূল প্রশ্নের সন্তোষজনক সমাধান করতে হবে। প্রথমত, কর সাশ্রয়ের এই সুবিধা বিনিয়োগকারীরা সাধারণ গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছাবেন কি না। দ্বিতীয়ত, মাত্র ১৮০ দিনের মধ্যে বড় প্রকল্পগুলোর আর্থিক চুক্তি ও আমদানি প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হবে কি না। এবং তৃতীয়ত, ছয় মাস পর সরকারের নীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না। দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা এবং গ্রিড ও স্টোরেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা গেলেই কেবল ১ শতাংশ করের এই সুবিধা দেশের বিদ্যুৎ খাতে সত্যিকারের বিপ্লব বয়ে আনতে সক্ষম হবে।