মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাতের কারণেই মূলত থমকে আছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। তবে এই সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আইনি লড়াই আরও জোরদার করেছে বাংলাদেশ সরকার। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার তথ্যের মধ্যে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জনের তথ্য যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।
আজ সোমবার (৩০ মার্চ) জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।
ঐতিহাসিক সাফল্য ও বর্তমান সরকারের রূপরেখা
সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অতীতের সফল প্রত্যাবাসনের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার থেকে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে তাদের সফলভাবে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আরও প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারও অতীতের এই সফল অভিজ্ঞতার আলোকে বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
তথ্য যাচাইকরণের হালনাগাদ চিত্র
রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে ঢাকা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, মোট ৬টি ধাপে এ পর্যন্ত ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের (২০২৬ সালের) জানুয়ারি পর্যন্ত ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জনের তথ্য যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছে মিয়ানমার। এই যাচাইকৃতদের মধ্যে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৪ জনকে তারা তাদের দেশের ‘সাবেক বাসিন্দা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেছে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ও আইনি লড়াই
রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত বছরের (২০২৫ সালের) ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি উচ্চপর্যায়ের ইভেন্ট আয়োজন করা হয়। সেখানে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া, একই বছরের ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন সংলাপে ঢাকার কূটনৈতিক মিশন, জাতিসংঘ সংস্থা ও রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
পাশাপাশি, নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ গণহত্যা মামলাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। ড. খলিলুর রহমান সংসদকে জানান, গত ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি (২০২৬) মামলাটির মেরিট ফেইজ বা মূল পর্বের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আইনি লড়াই জোরালোভাবে চালিয়ে নিতে গাম্বিয়াকে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
জেনেভা ও ওআইসিতে জোরালো অবস্থান
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমানে জেনেভায় চলমান জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনেও রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এছাড়া, ওআইসির (OIC) পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দুটি আলাদা প্রস্তাব বা রেজুল্যুশন গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন ছাড়া এই সংকটের আর কোনো বিকল্প সমাধান বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।