• রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ০৪:৩৪ অপরাহ্ন
Headline
সীমান্তে রক্তপাত বন্ধ না করলে ভারতের সঙ্গে স্থায়ী বন্ধুত্ব অসম্ভব: রুহুল কবির রিজভী নৌযাত্রা শতভাগ নিরাপদ করতে সর্বোচ্চ সতর্ক সরকার: নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আসন্ন বাজেটে জ্বালানি, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিপুল ভর্তুকি বাড়াচ্ছে সরকার সোশ্যাল মিডিয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে জনসচেতনতা কার্যক্রমে বড় বাধা: তথ্যমন্ত্রী শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতিতেও গণতন্ত্র থাকতে হবে: অর্থমন্ত্রী মা দিবসে মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে সেরা ৮টি স্মার্ট গ্যাজেট ‘পুলিশকে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না’ — পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোড়া হত্যা মামলায় আসাদুজ্জামান নূরের জামিন: হাইকোর্টের আদেশে কারামুক্তির পথে ‘বাকের ভাই’ সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দিকে এগোচ্ছে সরকার

৬ দশকের প্রথা ভেঙে তামিলনাড়ুতে বিজয়ের সরকার: 

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে রচিত হলো এক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী ইতিহাস। গত ছয় দশক ধরে এই রাজ্যটি কেবল দুটি প্রধান দ্রাবিড় দলের (ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে) শাসনেই আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ৬০ বছরের সেই প্রথা ভেঙে তামিলনাড়ুর ক্ষমতার মসনদে প্রথমবারের মতো আসীন হলো সম্পূর্ণ নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তি। দক্ষিণী সিনেমার মেগাস্টার থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম’ (টিভিকে) বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছে। আর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজয়ের এই ঐতিহাসিক মন্ত্রিসভায় শপথ নেওয়ার দিন সবার নজর কেড়ে নিয়েছেন মাত্র ২৯ বছর বয়সী এক তরুণী।

তার নাম এস. কীর্তনা। প্রথাগত রাজনীতির ভারী ভারী নেতাদের ভিড়ে মন্ত্রিসভার সবচেয়ে কনিষ্ঠ এবং প্রথম মন্ত্রিসভার একমাত্র নারী সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি এখন সমগ্র ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কে এই কীর্তনা? কীভাবে তিনি এত অল্প বয়সে তামিলনাড়ুর মতো একটি জটিল রাজনৈতিক অঙ্গনে মন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন? চলুন জেনে নেওয়া যাক এই তরুণীর উত্থানের নেপথ্য কাহিনি।


শিবকাশীর ‘আতশবাজি’: সর্বকনিষ্ঠ ও একমাত্র নারী মন্ত্রী

ভারতের ‘আতশবাজির রাজধানী’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত তামিলনাড়ুর বিরুধুনগর জেলার শিবকাশী (Sivakasi)। এই শিবকাশী বিধানসভা আসন থেকেই বিজয়ের দল টিভিকে-এর টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়েছেন এস. কীর্তনা। শিবকাশীর আতশবাজির মতোই যেন তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছেন এই তরুণী।

থালাপতি বিজয়ের মন্ত্রিসভা যখন গঠিত হচ্ছিল, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল বর্ষীয়ান ও অভিজ্ঞ নেতাদেরই হয়তো প্রাধান্য দেওয়া হবে। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিজয় যখন ২৯ বছর বয়সী কীর্তনাকে শপথবাক্য পাঠ করার জন্য ডাকেন, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, টিভিকে সরকার প্রথাগত রাজনীতির ছক ভেঙে নতুন প্রজন্মকে সামনে আনতে বদ্ধপরিকর। মন্ত্রিসভায় একমাত্র নারী প্রতিনিধি হিসেবে কীর্তনার অন্তর্ভুক্তি তামিলনাড়ুর নারী ক্ষমতায়নে এক বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।


পর্দার আড়ালের কারিগর থেকে সরাসরি রাজপথে

কীর্তনা কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান নন, কিংবা তিনি ছাত্রজীবন থেকে ঐতিহ্যবাহী রাজপথের রাজনীতিও করে আসেননি। তার রাজনৈতিক উত্থানের গল্পটি সম্পূর্ণ আধুনিক ও করপোরেট ধাঁচের। সক্রিয় এবং দৃশ্যমান রাজনীতিতে আসার আগে কীর্তনা একজন পেশাদার ‘পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট’ বা রাজনৈতিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করতেন।

ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘শো-টাইম কনসাল্টিং’ (Showtime Consulting)-এর হয়ে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। পর্দার আড়ালে থেকে নির্বাচনের ছক কষা, ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের কৌশল নির্ধারণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে ডেটা-ভিত্তিক জনসংযোগ গড়ে তোলায় তিনি একজন দক্ষ কারিগর। এর আগে প্রতিবেশী রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবু নাইডুর দল টিডিপি-এর (TDP) বিশাল নির্বাচনী প্রচারণাতেও তিনি নেপথ্যের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।


ডিজিটাল বিপ্লব ও বিজয়ের আস্থা অর্জন

থালাপতি বিজয় যখন নিজের রাজনৈতিক দল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ডিএমকে বা এআইএডিএমকে-এর মতো সুসংগঠিত দলের বিপরীতে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করানো। এই কঠিন সময়েই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন কীর্তনা।

টিভিকে-এর একদম প্রাথমিক পর্যায়ে রাজ্যের তরুণ সমাজকে সংগঠিত করা, সোশ্যাল মিডিয়ায় দলের পক্ষে জনমত গঠন করা এবং আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে বিজয়ের বার্তাকে প্রতিটি গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কীর্তনা অভাবনীয় সাফল্য দেখান। রাজনৈতিক ময়দানে সরাসরি না নেমেই তিনি পর্দার আড়াল থেকে দলের ভিত্তি মজবুত করেন। তার এই আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি, ডেটা-অ্যানালাইসিস এবং নিখুঁত নির্বাচনী পরিকল্পনার প্রতি প্রবল আস্থা তৈরি হয় বিজয়ের। আর সেই আস্থারই চূড়ান্ত পরিণতি হলো আজকের এই মন্ত্রিত্ব। যিনি একসময় অন্যদের ভোটে জেতানোর কৌশল বানাতেন, আজ তিনি নিজেই সেই কৌশলে বিজয়ী হয়ে জনগণের সেবক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।


হিন্দি ভাষায় বক্তব্য: দ্রাবিড় রাজনীতিতে এক সাহসী ও ব্যতিক্রমী বাঁকবদল

তামিলনাড়ুর রাজনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ‘হিন্দিবিরোধিতা’ বা অ্যান্টি-হিন্দি মুভমেন্ট। দ্রাবিড় দলগুলো সব সময়ই হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে এসেছে। তামিলনাড়ুর কোনো নেতার মুখে হিন্দি শোনাটা সেখানে প্রায় রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল বলে মনে করা হয়।

কিন্তু নির্বাচনে জয়ের পর কীর্তনা যখন জাতীয় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন, তখন তিনি অনর্গল হিন্দি ভাষায় কথা বলে সবাইকে চমকে দেন। তার এই পদক্ষেপ শুধু একটি ভাষার ব্যবহার ছিল না, বরং এটি ছিল এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক বার্তা।

হিন্দি বলার কারণ হিসেবে কীর্তনা অত্যন্ত সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের রাজনৈতিক আদর্শ, দলের লক্ষ্য এবং তামিলনাড়ুর নতুন দিনের বার্তাকে কেবল রাজ্যের গণ্ডিতে আটকে রাখলে চলবে না। সমগ্র ভারতের আপামর মানুষের কাছে বিজয়ের বার্তা পৌঁছে দিতেই তিনি হিন্দি ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। হিন্দিবিরোধী আন্দোলনের এই সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের মাঝে দাঁড়িয়ে একজন তামিল নেত্রীর এমন উদার ও জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত সাহসী এবং ব্যতিক্রমী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, বিজয়ের দল টিভিকে ভবিষ্যতে হয়তো জাতীয় রাজনীতিতেও ভূমিকা রাখার স্বপ্ন দেখছে।


থালাপতি বিজয়ের মাস্টারস্ট্রোক: নতুন দিনের ইঙ্গিত

কীর্তনাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়ে থালাপতি বিজয় আসলে একাধিক রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন:

১. তারুণ্যের জয়গান: রাজ্যের বিশাল তরুণ সমাজকে বার্তা দেওয়া যে, রাজনীতি কেবল বয়স্কদের জন্য নয়; যোগ্যতা থাকলে তরুণেরাও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

২. পেশাদারিত্বের মূল্যায়ন: গতানুগতিক আবেগভিত্তিক রাজনীতির বদলে ডেটা, প্রযুক্তি এবং পেশাদারিত্বকে সরকার পরিচালনায় গুরুত্ব দেওয়া।

৩. নারী ক্ষমতায়ন: মন্ত্রিসভায় একমাত্র নারী হিসেবে তাকে জায়গা দিয়ে নারীদের রাজনীতিতে আরও বেশি করে এগিয়ে আসার আহ্বান।

উপসংহার:

২৯ বছর বয়সী এস. কীর্তনার এই উত্থান কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং এটি ভারতের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আধুনিক প্রযুক্তি, মেধা এবং প্রথা ভাঙার সাহসিকতা নিয়ে তিনি এখন তামিলনাড়ুর পাশাপাশি পুরো ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। নতুন সরকারে তিনি কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান এবং একজন পেশাদার পরামর্শক থেকে একজন সফল মন্ত্রী হিসেবে নিজেকে কতটা প্রমাণ করতে পারেন, সেদিকেই এখন সবার নজর থাকবে।


তথ্যসূত্র: নিউজ ১৮


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category